একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে যখন সময় থমকে দাঁড়ায় এবং ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই এখন পঁচিশ বছরের নিচে। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলে অভিহিত করেন। এটি এমন এক সময় যখন কর্মক্ষম তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং একটি দেশ তার উন্নয়নের শিখরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। কিন্তু এ সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। এটি একটি স্বল্পস্থায়ী জানালা যা সঠিক সময়ে কাজে লাগাতে না পারলে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হতে পারে। প্রশ্ন হলো আমরা কি এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত?
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ বেকার এবং তাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশেরই বয়স ১৫-২৯ বছরের মধ্যে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসেবে নারীদের মধ্যে এই বেকারত্বের হার আরও উদ্বেগজনক। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয় বরং এগুলো আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার একেকটি দলিল। এগুলো লাখো তরুণের স্বপ্নভঙ্গের গল্প এবং অমিত সম্ভাবনার অপমৃত্যুর সাক্ষ্য। আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা সৃজনশীল এবং কর্মঠ কিন্তু তাদের মেধা বিকাশের সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
এ সংকটকে কেবল চাকরির বাজারের অভাব বা অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে আমরা ভুল করব। সমস্যাটি আরও অনেক গভীর ও মৌলিক। এটি মূলত একটি দার্শনিক ও কাঠামোকেন্দ্রিক সংকট। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো কি এমন নাগরিক তৈরি করতে পারছে যারা কেবল নিজের জীবিকা নয় বরং সমাজের জন্যও সম্পদ হয়ে উঠবে? উত্তরটি সম্ভবত নেতিবাচক। আমরা ডিগ্রিধারী তৈরি করছি কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছি না। আমাদের তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে এবং পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা আছে কিন্তু সেই শক্তিকে সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানোর মতো কোনো জাতীয় পরিকল্পনা নেই।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে তারা কীভাবে তাদের যুবসমাজকে জনসম্পদে রূপান্তর করেছে। সিঙ্গাপুরের মতো একটি ছোট দেশ যার কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই তারা কেবল মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারা ন্যাশনাল সার্ভিস বা জাতীয় সেবা কর্মসূচি চালু করেছে যা তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসেছে তাদের সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনীর ওপর ভর করে। সেখানে সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করেছে। সুইজারল্যান্ড এবং সুইডেনের মতো দেশগুলোতেও তরুণদের জন্য এমন কর্মসূচি রয়েছে যা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা শেখায় এবং ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমিয়ে আনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জুনিয়র আরওটিসি কর্মসূচির মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব ও নাগরিক গুণের বিকাশ ঘটানো হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন এমন একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় যুব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যা গতানুগতিক কারিগরি প্রশিক্ষণের চেয়েও বেশি কিছু হবে। এটি হতে হবে চরিত্র গঠনের একটি বিদ্যাপীঠ। ফায়ার ফাইটিং বা অগ্নিনির্বাপণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার মতো জরুরি দক্ষতা থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি পর্যন্ত সবকিছুই এই প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এর মূল লক্ষ্য হতে হবে মানসিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন। একজন তরুণ যখন জানবে যে দুর্যোগের সময় কীভাবে মানুষকে বাঁচাতে হয় বা জাতীয় সংকটে কীভাবে ভূমিকা রাখতে হয় তখন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটবে।
ভাবুন তো একবার যদি আমাদের স্কুল ও কলেজগুলোতে এমন ব্যবস্থা থাকত যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনসেবামূলক কাজে অংশ নিতে হতো তবে সমাজটা কেমন বদলে যেত। বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম বা মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে যে অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে তা ভেঙে ফেলার জন্য এটি হতে পারে এক মোক্ষম হাতিয়ার। যখন একজন বিত্তবান পরিবারের সন্তান এবং একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই প্রশিক্ষণ নেবে এবং একই ব্যারাকে থাকবে বা একই মাঠে ঘাম ঝরাবে তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা তৈরি হবে। এটি কেবল দক্ষতা উন্নয়ন নয় বরং এটি জাতীয় সংহতি তৈরির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায় তবে তারা দেশের জন্য বোঝা না হয়ে শক্তিতে পরিণত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ যে ঝুঁকির মুখে রয়েছে তা মোকাবিলা করতে হলে আমাদের তরুণদের পরিবেশ রক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্স বা তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি তাদের শিখতে হবে সহনশীলতা এবং পরমতসহিষ্ণুতা ও নৈতিকতা। কারণ একজন দক্ষ হ্যাকারের চেয়ে একজন নীতিবান প্রযুক্তিবিদ দেশের জন্য বেশি প্রয়োজন।
আমাদের বর্তমান যুব উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং অপর্যাপ্ত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো কেবল কিছু কারিগরি দক্ষতা শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল কারিগরি জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাধারা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা। আমাদের প্রস্তাবিত জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এ বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে। এই কর্মসূচিকে হতে হবে আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় যাতে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে বা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ পয়েন্ট বা অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একটি জাতির আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটি সংকটের সমাধানও হতে পারে এই যুব জাগরণ। যখন একটি প্রজন্ম জানবে যে তারা কারা এবং তাদের ইতিহাস কী ও তাদের গন্তব্য কোথায় তখন তাদের কেউ বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আমাদের তরুণরা বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং অতি সাম্প্রতিক সময়ের গণজাগরণ সবখানেই তরুণরাই ছিল চালিকাশক্তি। এই অমিত তেজ ও শক্তিকে এখন গঠনমূলক কাজে লাগাতে হবে। তাদের হাতে তুলে দিতে হবে দেশ গড়ার হাতিয়ার।
এই প্রশিক্ষিত যুবসমাজ কেবল দেশের ভেতরেই নয় বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। বর্তমানে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই অদক্ষ বা আধা দক্ষ। ফলে তারা তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য পান না। যদি আমরা তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে পারি তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যাবে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে একজন দক্ষ বাংলাদেশি যুবক বা যুবতী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। তাই আমাদের প্রশিক্ষণের মান হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের।
সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। জনমিতিক লভ্যাংশের এ সুযোগ অনন্তকাল থাকবে না। যেসব দেশ সময় থাকতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তারাই আজ বিশ্বনেতৃত্বে। আমাদেরও এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয় বরং আমাদের লক্ষ্য হলো একটি মানবিক ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন করা। একটি সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল প্রজন্মই পারে আগামীর বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের পিতা বা মাতা। তাদের আমরা যা শেখাব তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সেটাই শিখিয়ে যাবে। এভাবেই একটি জাতির দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তর ঘটে।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে শিক্ষা খাতে বা যুব প্রশিক্ষণে ব্যয় করা অর্থ কোনো খরচ নয় বরং এটি হলো শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের মুনাফা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতিকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আমাদের তরুণদের চোখের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই অপার সম্ভাবনা। তাদের শুধু একটু পথ দেখানো দরকার। তাদের কাঁধে হাত রেখে বলা দরকার যে আমরা তোমাদের ওপর বিশ্বাস রাখি। তাদের হাতে প্রয়োজনীয় রসদ ও প্রশিক্ষণ তুলে দিলে তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে।
আমরা স্বপ্ন দেখি এমন এক বাংলাদেশের যেখানে প্রতিটি তরুণ হবে দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক ও আত্মবিশ্বাসী। তারা কেবল নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাববে না বরং ভাববে তার দেশের কথা এবং তার সমাজের কথা। তারা হবে বিশ্বনাগরিক কিন্তু তাদের শেকড় থাকবে বাংলাদেশের মাটিতে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনা। তারুণ্যের এই শক্তিকে যদি আমরা জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি তবে বাংলাদেশ হবে অপ্রতিরোধ্য। ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখা হবে এই তরুণদের হাতেই এবং সেই ইতিহাস হবে বিজয়ের ও সমৃদ্ধির। তাই আসুন আমরা আর দেরি না করে আমাদের তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করি কারণ তারাই আমাদের বর্তমান এবং তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের প্রতিটি কোণ থেকে উঠে আসুক একেকজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ যারা পৃথিবীর বুকে লাল সবুজের পতাকাকে সগৌরবে উড্ডীন রাখবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন