আন্তর্জাতিক লজিস্টিক ম্যানেজার হলেন সেই পেশাদার ব্যক্তি যিনি একটি পণ্যকে তার উৎপত্তিস্থল থেকে বিশ্বের গন্তব্যে দক্ষতা ও সাশ্রয়ের সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ও রুটে সমুদ্র, আকাশ ও স্থলপথের শিপমেন্টের পরিকল্পনা ও তদারকি করা। আমদানি-রপ্তানির সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (এলসি, বিল অব লেডিং, চালান) তৈরি এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করে থাকেন। পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর দর-কষাকষি করে খরচ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাপ্লাই চেইন এর সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করেন। শিপমেন্ট বিলম্ব বা পণ্যের ক্ষতির মতো ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করা তার গুরু দায়িত্ব। সরবরাহ ও পরিবহন বিশ্লেষণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করে থাকেন লজিস্টিক ম্যানেজার। ক্যারিয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক ম্যানেজার নিয়ে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কোম্পানি ডিবি সেংকার এর সিনিয়র ম্যানেজার রিয়াদ রায়হানের সঙ্গে কথা বলেছেন মিনহাজুর রহমান নয়নৎ
মূল দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্র
একজন আন্তর্জাতিক লজিস্টিক ম্যানেজারের প্রধান দায়িত্বগুলো কেবল পণ্য পরিবহন নয়, বরং সমগ্র সাপ্লাই চেইন এর আন্তর্জাতিক অংশকে সুসংগঠিত করে তোলা।
পরিবহন পরিকল্পনা ও সমন্বয়
প্রতিটি শিপমেন্টের জন্য সবচেয়ে দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য সমুদ্রপথ, আকাশপথ (এয়ার ফ্রেইট) ও স্থলপথ রুট নির্বাচন করা এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা এরপর পাঠিয়ে থাকেন শিপমেন্টে তারপর শিপমেন্ট তদারকি করে বিভিন্ন দেশ ও বন্দরের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে পণ্য লোডিং, ট্রানজিট এবং ডেলিভারির প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। পণ্যের ধরন, পরিমাণ, মূল্য এবং জরুরি অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কনটেইনারের প্রকারভেদ (যেমন- ঋঈখ, খঈখ, রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনার) ও উপযুক্ত পরিবহন সংস্থা নির্বাচন করা লজিস্টিক ম্যানেজারের দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ডকুমেন্টেশন ও কমপ্লায়েন্স
আমদানি ও রপ্তানির জন্য অত্যাবশ্যকীয় সমস্ত বাণিজ্যিক কাগজপত্র যেমন- লেটার অব ক্রেডিট, বিল অব লেডিং, কমার্শিয়াল ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট এবং সার্টিফিকেট অব অরিজিন সঠিকভাবে তৈরি, যাচাই ও ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধান করা। বিভিন্ন দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে তদারকি করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন, শুল্ক হার এবং এইচএস কোড কঠোরভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শর্তাবলি যেমন- ঋঙই, ঈওঋ, উউচ ইত্যাদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে বিক্রেতা ও ক্রেতার দায়িত্ব ও ঝুঁকি নির্ধারণ করা।
খরচ নিয়ন্ত্রণ ও দর-কষাকষি
শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, পরিবহন সংস্থা, কাস্টমস ব্রোকার এবং অন্যান্য ভেন্ডরদের সঙ্গে অত্যন্ত কার্যকরভাবে দর-কষাকষি করে পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত করা। লজিস্টিক কার্যক্রমের জন্য একটি কার্যকর বাজেট তৈরি ও তা মেনে চলা এবং খরচ কমিয়ে আনার জন্য ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সমস্যা সমাধান
শিপমেন্ট বিলম্ব, পণ্যের ক্ষতি, রুট পরিবর্তন বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অপ্রত্যাশিত ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা। যেকোনো সমস্যা বা অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর সমাধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে সাপ্লাই চেইনের প্রবাহ ব্যাহত না হয়। পণ্য সরবরাহকারী, গুদাম, উৎপাদনকারী, পরিবহনকারী এবং চূড়ান্ত ক্রেতার সঙ্গে নিয়মিত ও নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে একটি সুসংগঠিত এবং নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন তৈরি করা।
পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ ও রিপোর্টিং
সময়মতো পণ্য সরবরাহ, পরিবহন খরচ এবং পরিবহন সময় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো বিশ্লেষণ করা। এ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত ও সুনির্দিষ্ট রিপোর্ট প্রদান করা এবং উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা।
জ্ঞান ও দক্ষতা
এই পেশায় সফল হতে হলে একজন ম্যানেজারের বেশ কিছু বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়:
বাণিজ্যিক জ্ঞান : আন্তর্জাতিক কাস্টমস আইন, শুল্ক হার, এইচএস কোড সম্পর্কে গভীর ধারণা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শর্তাবলি ওহপড়ঃবৎসং (ঋঙই, ঈওঋ, উউচ)-এর সঠিক প্রয়োগ। লেটার অব ক্রেডিট প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান।
পরিবহন জ্ঞান- সমুদ্র, আকাশ ও স্থলপথ পরিবহনের পদ্ধতি, গ্লোবাল শিপিং রুট, ট্রানজিট সময় এবং কনটেইনারের প্রকারভেদ সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান। মালবাহী বিমা সম্পর্কিত নীতি ও দাবি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা : লজিস্টিক/ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার, এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং সিস্টেম যেমন ঝঅচ/ঙৎধপষব-এর ব্যবহার। ডেটা বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস তৈরি ও রিপোর্ট তৈরির জন্য উন্নত মাইক্রোসফট এক্সেল ব্যবহার করার দক্ষতা।
সফট স্কিলস : আন্তর্জাতিক স্তরে কার্যকর মৌখিক ও লিখিত ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা অপরিহার্য। পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সফল দর-কষাকষি করার সক্ষমতা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, সময় ব্যবস্থাপনা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং একটি লজিস্টিক টিমকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব ও সমন্বয় করার ব্যক্তিগত দক্ষতা।
অভিজ্ঞতা : সাধারণত সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২-৫ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়।
চাকরির সুযোগ ও ক্যারিয়ারের পরিধি
আন্তর্জাতিক লজিস্টিক ম্যানেজারের চাকরির ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত এবং বৈচিত্র্যময়। যেসব বহুজাতিক কোম্পানি বিশ্বব্যাপী পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করে, তাদের সাপ্লাই চেইন বিভাগে উচ্চপদে কাজ করার সুযোগ। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, জুয়েলারি বা অন্যান্য বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে লজিস্টিকস প্রধান হিসেবে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান (যেমন: উই ঝপযবহশবৎ, কঁবযহব + ঘধমবষ, গধবৎংশ) এবং শিপিং লাইন ও এজেন্ট অফিসে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পদে। কাস্টমস ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বা ট্রেড কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা। দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স কোম্পানি এবং বৃহৎ রিটেইল চেইনগুলোতে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার জন্য লজিস্টিক ম্যানেজারদের চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া।
এই পেশায় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আপনি লজিস্টিকস ম্যানেজার থেকে সিনিয়র লজিস্টিকস ম্যানেজার, হেড অব লজিস্টিকস বা এমনকি সাপ্লাই চেইন ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি লাভ করতে পারেন।

