প্রযুক্তি খাতকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও লাভজনক ক্যারিয়ার ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হতো। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, টেক সেক্টরের কর্মীরা পেয়েছেন উচ্চ বেতন, স্থায়ী চাকরি এবং দ্রুত ক্যারিয়ার বৃদ্ধির সুযোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ছাঁটাইয়ের ঢেউ অনেককে ভাবাচ্ছে টেক ক্যারিয়ার কি এখন আর ততটা নিরাপদ?
বিশেষত এআই যখন এন্ট্রি-লেভেল চাকরির বহু অংশ স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে, তখন কিছু মানুষের মনে হয়েছে, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা কম্পিউটার সায়েন্সের মূল্য কি কমে যাচ্ছে? ইন্টেল, মেটা, মাইক্রোসফটসহ নামি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাস্কান-হাজার ছাঁটাই এবং ট্রাম্প প্রশাসনের গবেষণা অনুদান কমানোর সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি খাতকে আরও চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এত পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও কম্পিউটার বিজ্ঞান অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন কম্পিউটার প্রকৌশল, ফলিত গণিত কিংবা ডেটা সায়েন্স এখনো সর্বোত্তম ক্যারিয়ার সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ এই ক্ষেত্রটি কেবল প্রোগ্রামিং শেখায় না, এটি শেখায় জটিল সমস্যা কীভাবে সৃজনশীলভাবে সমাধান করতে হয়। প্রোগ্রামিং এখানে কেবল সমাধান প্রকাশের একটি ধাপ মাত্র। যেমন, ১৯৯৫ সালে কম্পিউটার প্রকৌশলে ডিগ্রি নেওয়ার সময় পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের নবযাত্রা, সার্চ ইঞ্জিনের অনুপস্থিতি, ক্লাউড কম্পিউটিং বা মোবাইল ফোনহীন এক সময়েও যারা কম্পিউটার বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি রপ্ত করেছিলেন, তারাই পরবর্তী দুই দশকে গুগল সার্চ কিংবা অ্যাজিওরের মতো বড় বড় ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। কারণ সমস্যা সমাধানের প্রশিক্ষণ জীবনের সব পর্যায়েই কাজে লাগে।
অনেকে মনে করছেন, এআই যেন সবচেয়ে আগে আঘাত করছে সফটওয়্যার ডেভেলপারদের ওপর। কিন্তু বাস্তবে এআই প্রভাব ফেলবে জ্ঞানভিত্তিক সব পেশায়, গ্রাফিক ডিজাইনার, আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, সবাই এআই টুল ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন।
সফটওয়্যার খাত এআইয়ের ‘সহজ শিকার’ এমন নয়। বরং মানুষের সঙ্গে কম্পিউটারের যোগাযোগ বদলাচ্ছে, নতুন ভাষা, নতুন প্রযুক্তি, নতুন টুলস। সফটওয়্যার নির্মাতাদের প্রয়োজন কমে যাবে না, বরং দক্ষতার ধরন বদলাবে। যে কেউ কোড লিখতে পারবে, কিন্তু কোন সমস্যা সমাধান করা জরুরি, কোন সিস্টেম তৈরি করা মূল্যবান, কোন পণ্য মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে, এ সিদ্ধান্তগুলো নেবে এখনো মানুষই।
এআই পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো দুর্দান্তভাবে করতে পারে, যেমন মার্কেটিংয়ের লেখা তৈরি, কোডের কিছু অংশ লেখা, ডেটা সাজানো। কিন্তু কোন অ্যাপ বানানো উচিত, কোন সামাজিক সমস্যা সবচেয়ে জরুরি, কোন ভোক্তা-ব্যবহার আমাদের সমাধানকে চালিত করবে, এসব জায়গায় এখনো মানুষের বিচারশক্তি অপরিহার্য।
এ কারণেই ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘ক্রিটিকাল থিংকিং’ জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের ক্ষমতা।
ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘এআই সব বদলে দেবে’ এই আতঙ্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। শিক্ষার্থীদের সেই বিষয় বেছে নিতে হবে, যেখানে তারা সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে পারে এবং সমাজে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে।
কম্পিউটার বিজ্ঞান আজ আরও শক্তিশালী কারণ আমাদের হাতে এখন আছে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি এবং সামনে রয়েছে আরও কঠিন সমস্যার পাহাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষুধা, স্বাস্থ্যসেবা, সাইবার নিরাপত্তা, শক্তি ব্যবস্থাপনা। এসব সমাধানে দরকার দক্ষ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী।
এখন হয়তো চাকরির বাজার টেক-গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত নয়। কিন্তু চাকরির বাজার সবসময়ই চক্রাকারে ওঠানামা করে। কঠিন সময়গুলোই জ্ঞান গভীর করার এবং নিজেকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করানোর সেরা সময়। নতুন প্রজন্মের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ছাড়া নতুন প্রযুক্তি, নতুন সিস্টেম বা নতুন সমাধান তৈরি অসম্ভব। সমস্যার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের সমাধান করার মতো দক্ষ মানুষের সংখ্যা কমছে।
একটি উন্নত সমাজ গড়তে হলে আমাদের আরও বেশি কম্পিউটার বিজ্ঞানীর প্রয়োজন। যারা সৃজনশীলভাবে ভাবতে পারে, নৈতিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের ঝড়ের মাঝেও কম্পিউটার বিজ্ঞান এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যারিয়ার পথ। কারণ এটি শুধু একটি চাকরির নিশ্চয়তা নয়, এটি ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষমতা দেয়।
মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী মার্কাস ফনটোরার লেখা থেকে অনুপ্রাণিত

