বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি জাতীয় বিকল্প বা ছায়া বাজেট পেশ করেছে। এতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের পক্ষ থেকে জনমুখী বাজেট প্রস্তাবনা শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন বাজেট উপস্থাপন করেন।
বাজেটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়েছে দলটি। এর পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ বরাদ্দের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের এই বাজেটে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য খাতের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ১০ শতাংশ এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া বাজেট কার্যকর হবে না : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো সরকারের দেওয়া বাজেটই কার্যকর হবে না। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গতকাল রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা দেশকে ভালোবাসি বলেই জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের আলোকে কেমন বাজেট হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা জনগণের সামনে তুলে ধরছি। এটি কোনো চূড়ান্ত বাজেট নয়, বরং বাজেটের পূর্বধারণা বা প্রস্তাবনা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা করে আসছে। কিন্তু বারবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে জনগণ হতাশ হয়েছে এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশায় বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকিং খাত, বিমা ও বিভিন্ন করপোরেশনে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের কারণে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুঁজিবাজার সংকটে রয়েছে, আর ব্যাংকিং খাতও ঝুঁকির মুখে পড়লে দেশের অর্থনীতি আরও বড় বিপদের সম্মুখীন হবে।
বাজেট প্রস্তাবনার লক্ষ্য সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, এটি কোনো দলীয় বাজেট নয়; দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখেই প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। সরকার চাইলে এখান থেকে ইতিবাচক বিষয় গ্রহণ করতে পারে। তবে এর বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

