ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপে নজিরবিহীন নিরাপত্তা

পারভেজ খান
প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৫:১৬ এএম

ফিফা বিশ্বকাপ মানেই ফুটবলের মহাযজ্ঞ, যাকে বলা হয়ে থাকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে মাসব্যাপী এই মহাযজ্ঞ। এই উৎসব ঘিরে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো সমর্থক ছুটে যান মাঠে, ফ্যান জোনে কিংবা আয়োজক শহরগুলোতে। তবে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা মানুষের সংখ্যার চেয়েও বহুগুণ বেশি দর্শক বিশ্বকাপ উপভোগ করেন টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই শহর থেকে গ্রামÑ সবখানেই বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। প্রিয় দলের পতাকায় ছেয়ে যায় পাড়া-মহল্লা, ছাদ আর অলিগলি। রাত জেগে খেলা দেখেন কোটি কোটি বাংলাদেশি। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিতর্ক থেকে শুরু করে প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের আবেগ। সবকিছুই যেন এ দেশের মানুষের জীবনের একটি অংশ হয়ে ওঠে তখন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে বসতে যাওয়া এই আসরের নিরাপত্তা শুধু তিন দেশের বিষয় নয়; তা বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর আগ্রহের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন। এবারই প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে এই আসরে। তিন দেশের ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। আয়োজকদের হিসাবে, দর্শক, পর্যটক, কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক, গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মিলিয়ে কয়েক কোটি মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকবে এই টুর্নামেন্টে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায়, ২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ নয়; এটি আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থারও সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ কেবল নিউইয়র্ক, টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার বা মেক্সিকো সিটির স্টেডিয়ামে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর আবেগ পৌঁছে যাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট কিংবা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি ঘর থেকে শুরু করে অলিগলির চায়ের দোকানেও। মধ্যরাত পেরিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা কোটি বাংলাদেশির উল্লাস, হতাশা, প্রত্যাশা আর আবেগও এই বিশ্বকাপের অংশ।

ফুটবলের বাইরের বিশ্বমঞ্চ : নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্বকাপে কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী নয়; স্বাস্থ্য বিভাগ, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী, সাইবার বিশেষজ্ঞ, গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একই ছাতার নিচে কাজ করতে হবে। মেক্সিকোর কোনো শহরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার অন্য শহরগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপ আসলে একটি বহুজাতিক নিরাপত্তা পরীক্ষাগার, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে লাখো মানুষের নিরাপত্তা।

ফুটবলের ইতিহাসে এই বিশ্বকাপ হয়তো নতুন রেকর্ড, নতুন নায়ক এবং নতুন চ্যাম্পিয়নের জন্ম দেবে। কিন্তু এর সমান্তরালে বিশ্ব দেখবে আরেকটি লড়াইÑ কোটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লড়াই।

মাঠে ফুটবলাররা ছুটবেন গোলের খোঁজে। আর মাঠের বাইরে হাজারো নিরাপত্তাকর্মী, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও জরুরি সেবাকর্মীরা লড়বেন অন্য এক লক্ষ্য নিয়েÑ যেন ফুটবলের এই মহোৎসব আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকে, আতঙ্কের নয়।

নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা : একসময় বড় ক্রীড়া আসরের নিরাপত্তা মানেই ছিল স্টেডিয়ামের প্রবেশপথে তল্লাশি, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী নজরদারি। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিরাপত্তার ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। এখন হুমকি আসতে পারে আকাশে উড়তে থাকা একটি ছোট ড্রোন থেকে, হাজার মাইল দূরে বসে পরিচালিত সাইবার হামলা থেকে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একটি ভুয়া ভিডিও থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি গুজব লাখো মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে নিরাপত্তা এখন আর শুধু মাঠের চারপাশে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল জগৎ, সীমান্ত, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং তথ্যপ্রবাহের প্রতিটি স্তরে।

বিশ্বকাপে বড় চ্যালেঞ্জ সীমান্ত : এই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোর একটি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অভিবাসন, মাদক পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কারণে আলোচনায়। বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক, কর্মকর্তা ও পর্যটক এক শহর থেকে অন্য শহরে, এমনকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করবেন। এই বিপুল জনচলাচলের মধ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণেই তিন দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নজিরবিহীন সমন্বয়ের পথে হাঁটছে। গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য ভাগাভাগি, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যৌথ প্রতিক্রিয়ার জন্য ইতোমধ্যে একাধিক মহড়া ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নতুন আতঙ্ক ড্রোন : মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বকাপ ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত নতুন হুমকিগুলোর একটি হলো ড্রোন। কয়েক বছর আগেও ছোট আকারের ড্রোনকে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হতো না। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, স্বল্প খরচের ড্রোনও কৌশলগতভাবে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কোনো স্টেডিয়ামের ওপর অননুমোদিত ড্রোনের উপস্থিতি ম্যাচ বন্ধ করে দিতে পারে, দর্শকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি গুরুতর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় স্টেডিয়াম ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আকাশসীমা পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ রাডার, ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।

অদৃশ্য প্রতিপক্ষ সাইবার হামলা : বিশ্বকাপ এখন সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর একটি আয়োজন। টিকিট বিক্রি, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সম্প্রচার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, হোটেল বুকিং, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণÑ সবকিছুই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি বড় সাইবার হামলা পুরো আয়োজনকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যাকাররা টিকিটিং সিস্টেম অকার্যকর করতে পারে, দর্শকদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে কিংবা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও কোটি দর্শক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপ অনুসরণ করবেন। ফলে সাইবার নিরাপত্তা বিঘিœত হলে তার প্রভাব মাঠের গ-ি ছাড়িয়ে বাইরের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে যেতে পারে।

এআই যুগে নতুন উদ্বেগ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিরাপত্তাব্যবস্থাকে যেমন শক্তিশালী করছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও, ভুয়া সংবাদ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

ধরা যাক, কোনো স্টেডিয়ামে হামলার ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ল কিংবা কোনো তারকা ফুটবলারকে ঘিরে মিথ্যা তথ্য ভাইরাল হলোÑ মুহূর্তেই তা জনমনে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। সামাজিক মাধ্যমনির্ভর বাংলাদেশের দর্শকও এমন বিভ্রান্তির শিকার হতে পারেন। এ কারণে নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এবার ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলাকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তার আরেক পরীক্ষা : বিশ্বকাপের নিরাপত্তা শুধু স্টেডিয়ামের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। ম্যাচ ভেন্যুর বাইরে ফ্যান জোন, শহরের কেন্দ্রস্থল, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, গণপরিবহন কেন্দ্র এবং পর্যটন এলাকাগুলোতেও বিপুল মানুষের সমাগম হবে। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় জনসমাগমে পদদলিত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আয়োজকেরা উন্নত নজরদারির ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা এবং জনসমাগম ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন।

আয়োজকদের আশ্বাস : ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (সুইজারল্যান্ড) বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ। আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ও দর্শকসেবার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্বকাপ ঘিরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং কানাডা ও মেক্সিকোর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। তাই ২০২৬ বিশ^কাপের দর্শক মনে করছেন, বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার অর্থ শুধু কয়েকটি স্টেডিয়ামকে সুরক্ষিত রাখা নয়; বরং বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের সঙ্গে বাংলাদেশের অগণিত ফুটবলপ্রেমীর উৎসবকে নিরাপদ রাখা। মাঠের লড়াইয়ের সমান্তরালে চলবে আরেকটি নীরব লড়াইÑ যে লড়াইয়ের সাফল্যই নির্ধারণ করবে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব শেষ পর্যন্ত কতটা নির্বিঘœ ও স্মরণীয় হয়ে উঠবে।