× UCB Sticker Card
বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৫:১৮ এএম

ব্যাংক অনুদানের ফরেনসিক অডিটে চাঞ্চল্যকর তথ্য

১০ বছরে সিএসআর তহবিলে মহাডাকাতি

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৫:১৮ এএম

১০ বছরে সিএসআর তহবিলে মহাডাকাতি

বিগত ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা এক দশকে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরিত হয়েছে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি প্রতিষ্ঠান ‘এ কাশেম অ্যান্ড কোং’ পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক ফরেনসিক অডিটে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নতুন বোর্ড বিভিন্ন অসংগতি, সম্ভাব্য জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা খুঁজে বের করতে এই অডিটের উদ্যোগ নেয়। ৪১টি সদস্য ব্যাংকের মধ্যে ২৯টি ব্যাংক অডিটরদের পুরোপুরি তথ্য প্রদান করলেও বাকি ১২টি ব্যাংক কোনো তথ্য জমা দেয়নি। প্রতিবেদনটি মূলত বিএবি ও অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ২৯টি ব্যাংক সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকাই গেছে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এবং সূচনা ফাউন্ডেশনসহ শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এই অনুদান হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় বিএবি সরাসরি সদস্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১০৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠায় এবং বাকি ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা ব্যাংকগুলো সরাসরি বিএবির পাঠানো অনুরোধপত্রের ভিত্তিতে প্রদান করে। এ ছাড়া অডিটররা আরও ৫৬৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন, যা একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল, তবে এর পক্ষে বিএবির কোনো অফিসিয়াল চাহিদাপত্র বা দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বণ্টন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, সিএসআর কার্যক্রমে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা খাতে ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু অভিযোজন খাতে ২০ শতাংশ ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আয়বর্ধক কার্যক্রম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতেও অর্থ ব্যয়ের নিয়ম রয়েছে এবং যোগ্য বিবেচিত হলে ব্যাংকগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও অনুদান দিতে পারে। তবে অডিটে দেখা গেছে, সিএসআর পরিকল্পনার তোয়াক্কা না করে শুধু ত্রাণ, বন্যা মোকাবিলা ও শিক্ষা সহায়তার নামে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১ হাজার ১১১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা চেয়ারপারসন ছিলেন এমন প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এ দেওয়া হয়েছে ৩৭৪ কোটি টাকা, যার প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের কর্মসূচিতে। শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন হিসেবে পরিচালিত ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ পেয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। বাকি অর্থ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

তদন্তে আরও প্রকাশ পায়, ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে সরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে যে নানা কর্মসূচি ও অফিসে ‘মুজিব কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছিল, তার পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংকগুলো থেকে ব্যাপক অর্থ নেওয়া হয়। শুধু মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্যই ব্যাংকগুলো থেকে ১৭৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। এর বাইরে ক্রীড়া আয়োজন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ওপর নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের স্পন্সরশিপের পেছনে ব্যয় হয় আরও ৭৫ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে বিএবির সদস্য ব্যাংকগুলোকে চাপ দিয়ে সূচনা ফাউন্ডেশনের হিসাবে ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা জমা করানোর অভিযোগ রয়েছে এবং ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের পেছনে ব্যাংকগুলোর ওপর তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ ছিল বলে ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা স্বীকার করেছেন। বিএবির তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম ২০১৪ সালে সীমিত আকারে শুরু হলেও পরে তা ব্যাপক রূপ নেয়, যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তৎকালীন বিএবি চেয়ারম্যান ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত নাসা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম মজুমদার।

এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, শুরুতে ব্যাংকগুলো এই অনুদান দিতে রাজি ছিল না। পরে ব্যাংক নির্বাহীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হুমকি ও চাকরিচ্যুতির মতো গুরুতর চাপের মুখে পড়েন। তৎকালীন বিএবি চেয়ারম্যান নিজে অনুদান সংগ্রহের অগ্রগতি তদারকি করতেন এবং কেউ টাকা না দিলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নালিশ করা হতো, যার ফলে পরিচালনা পর্ষদগুলো অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। চাপের কারণে অনেক ব্যাংক সিএসআর ব্যয়ের নির্ধারিত সীমাও অতিক্রম করেছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাধ্য করা না হলে এই টাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা যেত।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খানও এই অরাজকতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো মাঝেমধ্যে প্রশ্ন তুলে সমস্যায় পড়ত এবং মুনাফা না থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যাংককে অনুদান দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকট ছিল, অনুদানের অর্থ শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তার ওপর ব্যাংকগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি ছিল না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, সিএসআরের অর্থ এখানে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চরম ঘাটতির কারণে এই অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এই অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রকৃত সুফল পেত। তিনি সিএসআর তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বর্তমান নিয়ম-কানুন পুনর্বিবেচনার তাগিদ দেন।

মূল রাজনৈতিক অনুদানের বাইরেও অডিটররা গত এক দশকে আরও ৫৩৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক ও ‘অযোগ্য’ লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন, যার সঙ্গে কোনো ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের সম্পর্ক বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছিল না। এর মধ্যে সদস্য ব্যাংকগুলোর দেওয়া ৪৭০ কোটি টাকার অনুদানের তথ্যের কোনো দালিলিক প্রমাণ মেলেনি। ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা অনুদানের পক্ষে প্রাপকের স্বীকৃতি বা ব্যাংকিং নথি নেই এবং সমাপনী ব্যাংক হিসাবে ১৪ লাখ টাকা কম দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৯৯ লাখ টাকার নগদ অনুদান, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া বা অস্তিত্বহীন সরবরাহকারীর কাছ থেকে ৭৬ লাখ টাকার কেনাকাটা, নথিপত্রহীন ওভারটাইম বিল, ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লেনদেন, কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, একটি চেকে একাধিক ভেন্ডারকে অর্থ পরিশোধ, অনিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মিটিং খরচ, অনুমোদনহীন সম্মানি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ভুয়া ইনভয়েসের মতো মারাত্মক আর্থিক অব্যবস্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে। এমনকি অনুমোদন ছাড়াই ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এক খাত থেকে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; যার একটি ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তার নামে তোলা অর্থ অটিস্টিক শিশুদের একটি বিশেষায়িত স্কুলে দেওয়া হয় এবং অন্য একটি ঘটনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তার কথা বলে টাকা তুলে তার মধ্যে ১ কোটি টাকা এক জ্যেষ্ঠ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তার কাছে অ্যাকাউন্ট-পেয়ি চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয়।

সমগ্র অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিএবির তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারকে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে এক আন্দোলনকারী নিহতের মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করার মাধ্যমে সেখানে নজরুলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র প্রভাবের অবসান ঘটায়। বর্তমানে নজরুল ইসলাম মজুমদার কারাগারে রয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে বিএবির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার জানান, অতীতে যা হয়েছে তা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমান বিএবি বোর্ড পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং সরকার চাইলে অতীতের এই জঘন্য অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!