রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘সংকটাপন্ন’ অবস্থাতেই রয়েছেন। তবে গত শুক্রবারের থেকে গতকাল শনিবার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসক ও দলটির শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে তার চিকিৎসা চলছে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। খালেদা জিয়া কিছুটা ভালো হলেও শঙ্কামুক্ত নন।
বিএনপির প্রধান নেত্রীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে গতকাল শনিবার রাত ৯টার দিকে বিফ্রিং করেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা আপাতত রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালেই চলবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে এই হাসপাতালে চিকিৎসা অব্যাহত আছে। তাকে বিদেশে নেওয়া হবে কি না, সেটি তার শারীরিক সুস্থতা ও মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।’
ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন যে খালেদা জিয়ার আরও নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দরকার। এরপর তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে গত ২৭ তারিখ সকাল বেলা খালেদা জিয়াকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসার সার্বিক কার্যক্রম তদারক করছেন তার ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়ার এই ব্যক্তিগত চিকিৎসক বলেন, ‘বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি খালেদা জিয়ার শারীরিক সুস্থতা ও মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। মেডিকেল বোর্ড এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হবে।’
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার চিকিৎসক দলের এক সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গতকাল শনিবার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি হাত-পা নাড়াচ্ছেন। চিকিৎসকদেরও চিনতে পারছেন। তবে এখনো তিনি আশঙ্কামুক্ত নন।
এদিকে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায়ও তার জন্য দোয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে গত শুক্রবার রাত থেকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উদ্বিগ্ন নেতাকর্মীরা ভিড় জমান। গতকাল শনিবার দিনভর সেই ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ফলে বাধ্য হয়েই নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে ভিড় না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
উন্নত চিকিৎসায় বিদেশে পাঠানোর চিন্তা, শারীরিক পরিস্থিতিতে সম্ভব নয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে পরিবারের। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কাতার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে শারীরিক পরিস্থিতি বিদেশে নেওয়ার অবস্থায় নেই উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘শারীরিক অবস্থা আল্লাহর অশেষ রহমতে যদি স্টেবল (স্থিতিশীল) হয়, তখন চিন্তা করে দেখা হবে যে তাকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব হবে কি না।’
গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে আছেন, তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসক, আমেরিকার জন হপকিন্স এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা তার চিকিৎসা করছেন। গত শুক্রবার রাতে তারা একটা মেডিকেল বোর্ড সভা করেছেন আড়াই ঘণ্টা ধরে। সেখানে তারা সমস্ত চিকিৎসকের মতামত নিয়ে কথা বলেছেন এবং কীভাবে তারা চিকিৎসা করবেন এবং সেই চিকিৎসা কী ধরনের হবে, সে বিষয়ে তারা মতামত দিয়েছেন নিজেদের মেডিকেল বোর্ডে।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন, এ কথা তারা (চিকিৎসকেরা) বলছেন যে হয়তো প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু তার এখন বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা নেই। তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো রয়েছেÑ ভিসা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে... যেসব দেশে যাওয়া সম্ভব হতে পারে, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাপারগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে কাজ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ, যদি প্রয়োজন হয় এবং দেখা যায় যে ‘সি ইজ রেডি টু ফ্লাই’, তখন তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।’
একই কথা জানিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন লন্ডনে যে হাসপাতালে এর আগে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাকে লন্ডনে নিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কাতার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তার চিকিৎসা মূলত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান।’
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলে দ্রুত বিদেশে নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খানও। তিনি বলেন, বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তৈরি হলেই কেবল এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
আযম খান বলেন, খালেদা জিয়া সিসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে কথা হয়েছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা অনুমতি দিলেই তাকে বিদেশে নেওয়া হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থায় খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন।
দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইলেন রাষ্ট্রপতি
খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সাগর হোসেন এক বার্তায় এ তথ্য জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গণতন্ত্র উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। মহান আল্লাহর নিকট তার সুস্থতা, একই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া প্রার্থনা করি।’
উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এই বিশেষ সভার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এ ছাড়া বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন এবং এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেক স্থানে দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে বিশেষ খাবারও বিতরণ করা হয়েছে।
৭৯ বছর বয়সি খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। গত রোরবার রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে ঢাকার বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বুকে ‘সংক্রমণ’ ধরা পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই উনি (খালেদা জিয়া) খুব ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছিলেন। আমরা যে কারণে (এভারকেয়ার হাসপাতালে) ভর্তি করিয়েছি, সেটা হচ্ছে যে, ওনার কতগুলো সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিয়েছে। সেটা হচ্ছে, ওনার বুকে সংক্রমণ হয়েছে। যেহেতু ওনার হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। ওনার হার্টে স্থায়ী পেসমেকার আছে এবং হার্টে ওনার স্ট্যান্টিং (রিং পরানো) করা হয়েছিল, রিং পরানো হয়েছিল। হার্ট ও ফুসফুস দুটোই একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ায় ওনার খুব শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা হচ্ছিল। সে জন্য এখানে (এভারকেয়ার হাসপাতালে) আমরা খুব দ্রুত তাকে নিয়ে এসেছি।’
হাসপাতালে নেতাকর্মীদের ভিড়
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ার খবরে শুক্রবার রাত থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে বেড়েছে দলটির নেতাকর্মীদের ভিড়। শুধু বিএনপি নয়, সরকারের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও খালেদা জিয়ার সর্বশেষ খোঁজ নিতে হাসপাতাল আঙ্গিনায় ভিড় করেছেন। ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তবে নেতাকর্মীদের সেখানে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল বলেন, ‘আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে গোটা দেশবাসীর কাছে জানাতে চাই যে, স্বাভাবিকভাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তার অসুস্থতায় সব মানুষই উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন