ঢাকা রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

পকেট ভর্তির প্রকল্প গঙ্গাচড়া বালুর বাঁধ

রেজাউল করিম, রংপুর
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০১:১৩ এএম

তিস্তা নদীর তীর রক্ষায় চলছে দেড় কোটি টাকার বাঁধ সংস্কার প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে বালু লুট, রাজনৈতিক প্রভাব, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও ঠিকাদারদের পকেট ভর্তির প্রকল্পে। ইস্টিমেট (প্রাক্কলন) নিয়ম লঙ্ঘন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলাসহ নানা অনিয়ম চলছে প্রকল্প ঘিরে। প্রশাসনের নীরব, সব কিছুই ঘটছে স্থানীয়দের চোখের সামনে। নদীর তীর রক্ষার পরিকল্পনায় নেওয়া হলেও তা না হয়ে উল্টো স্থানীয়দের জন্য নতুন বিপদ হয়ে উটেছে প্রকল্পটি।

রংপুর পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ইউএনডিপির অর্থায়নে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ডান তীর (১২০৬ মিটার) রক্ষা বাঁধ সংস্কারের জন্য ১ কোটি ৩৮ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসিবুল হাসান। কিন্তু বাস্তবে কাজ করছেন রংপুরের ভরত প্রসাদ নামের এক সাব-ঠিকাদার। ইতিমধ্যে বাঁধ সংস্কারের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পাউবো এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সরেজমিন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

জানা গেছে, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে কাজের ধরন ও প্রাক্কলনের বিবরণ দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নোটিশ বোর্ড টাঙানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামকে ম্যানেজ করে গোপনে কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পের ইস্টিমেটে (প্রাক্কলন) বলা হয়েছে, বাঁধে মাটি ফেলার আগে নদীর পাড়ে কমপক্ষে ৬০ মিলিমিটার বাঁশের খুঁটি, পেগ ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি দড়ি ব্যবহার করে প্রোফাইল স্থাপন করতে হবে।

এ ছাড়া দূরের এলাকা থেকে ট্রাক, নৌকা বা অন্য মাধ্যমে মাটি, কাদা, সিল্ট ও প্রয়োজনীয় মিশ্রণ আনার কথা। ভরাট শেষে বাঁধে ঘাস ও গাছের চারা রোপণের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ইস্টিমেটে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নোহালী ইউনিয়নের মাঝাপাড়া থেকে বৈরাতী এলাকা পর্যন্ত ৩০০ মিটার বাঁধের কাজ শুধু বালু ফেলেই শেষ করা হয়েছে। আর বাকি কাজের জন্য সেখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে সাপমারি এলাকায় নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বাঁধে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বালু উত্তোলনের বিষয়ে কথা হয় শ্রমিক সেরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরাই চারজন এখানে বালু উত্তোলনের কাজ করি। আমাদের চারজনকে দৈনিক ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর মেশিনের তেল ঠিকাদার দেয়। নদীর বালু তোলার পাউবোর এক্সইএন (নির্বাহী প্রকৌশলী) স্যার জানেন।’

কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম, মাহফুজা বেগম, হামিদসহ বৈরাতী এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘এখানকার আশরাফ চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের মামা সাবেক মেম্বার ওয়াহেদ, বকুল মেম্বার (ইউপি সদস্য ও নোহালী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব), আজহারুল মেম্বার এই কাজের সদস্য। এরাই নদীতে মেশিন বসিয়ে বাঁধে বালু তুলছেন। এর আগে বাইরে থেকে মাটি আনার কথা ছিল। টাকা নাকি বেশি লাগে, এ জন্য তাঁরা নদীতে মেশিন বসিয়ে বালু তুলছেন। কিছু বালু এখানে ফেলছেন, আর বেশির ভাগ বালু ট্রলি দিয়ে বিক্রি করছেন। কিছু বলতে গেলে বলেন, “‘আমরা সরকারের কাজ করছি। মহিলা মানুষ, বেশি কথা না বলে এখান থেকে যান।’ এ জন্য আমরা কিছু বলি নাই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি ৩৭ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ করেছি। এখন আমার বয়স ৭০। এরা যে কাজগুলো করছে এভাবে কাজ করলে চিন্তা করেন, সামনের বন্যায় আমাদের বাড়িঘর ভেঙে যাবে, এখান থেকে পালাতে হবে। এই যে নদীর বালুগুলো তুলছে আবার বিক্রি করছে, এগুলো তো পাউবোর এক্সইএনের সামনেই তুলছে। প্রথমে এলাকার লোকজন বাধা দিছিল, তাতে এক্সইএনের যে ব্যবহার! এক্সইএন বলেন, ‘আপনারা এখানে কী বুঝবেন? বেশি কথা না বলে এখান থেকে যান।’

জানতে চাইলে সাব-ঠিকাদার ভরত প্রসাদ মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান, বিএনপির তিন সদস্য আর এনসিপির নেতাদের ম্যানেজ করেই কাজ করি। তাঁদের বাদ দিয়ে কি সেখানে কাজ করা যাবে?’ বাঁধ সংস্কারকাজে বাঁশ সরবরাহ করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝখানে শুনলাম ওদের মধ্যেই হিসিং (মারামারি) চলছে। এ বাঁশ কাটে, ও বাঁশ কাটে, এনসিপি কাটে, জামায়াত কাটে, বিএনপি কাটেÑওরা মারামারি লাগাইছে। এ জন্যই আমি এখন সাইটে যাওয়া বন্ধ করেছি। বলেছিÑআগে ওদের মীমাংসা হোক।’ কোন কোন দলের নেতা প্রভাব খাটায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো বলে কী হবে? কাজটা তো আমাকে দীর্ঘ মেয়াদে করতে হবে। পুলিশ না হয় এক দিন-দুই দিন যাবে, এরপর কী হবে?’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য ও ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলো সবাই মিলে আমরাই করতেছি। সমস্যা নাই, আপনাদের (সাংবাদিক) বিষয়টা দেখা যাবে।’

জাতীয় পার্টির নোহালী ইউনিয়ন সভাপতি ও বর্তমান নোহালী ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ‘ওনাকে (সাব-ঠিকাদার) সঙ্গে নিয়ে আসেন। সে আমার সঙ্গে কথা বলে না, আর আপনাকে বলছে আমাকে নাকি ম্যানেজ করছে।’

উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকার বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে আমার জানা নেই। তবে যদি কোনো ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা এর সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের অপকর্ম করার সুযোগ নেই।’ এনসিপির উপজেলা প্রধান সমন্বয়কারী রিফাত চৌধুরী বলেন, ‘আমি এসব সম্পর্কে কিছুই জানি না।’

গঙ্গাচড়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির নায়েবুজ্জামান বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে বিষয়টি শোনার পর আমরা ওই ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের বিষয়ে কিছু বলেননি। আমরা বলতে পারি, আমরা বা আমাদের নেতা-কর্মী কেউ এই বিষয়ে কিছু জানেন না।’

রংপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের কাছে তিস্তা থেকে বালু তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘তিস্তা থেকে বালু না তুললে কাজ করবে কোন বালু দিয়ে?’ পরে তার সামনে ইস্টিমেট বের করে নিয়মের কথা জানালে তিনি বলেন, ‘আমি তো অনিয়ম দেখে কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। আর সেখান থেকে ওই বালু সরাতে বলেছি। সব সরিয়ে নতুন করে কাজ করতে বলেছি।’

এ বিষয়ে ইউএনও মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘নোহালী ইউনিয়নের বাঁধের কাজ ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ এনামুল আহসান বলেন, ‘নোহালী ইউনিয়নের পাউবোর কাজ এবং বালু উত্তোলন বিষয়ে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবেন।’