কাতার বিশ্বকাপে মরুভূমির বুকে লিওনেল মেসির হাতে সোনালি ট্রফি ওঠার পর দেখতে দেখতে কেটে গেছে চারটি বছর। বিশ্ব ফুটবলে আবারও বেজে উঠেছে মহাযুদ্ধের দামামা। ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার তিন দেশÑ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বসতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম ফুটবল বিশ্বকাপ। ৪৮টি দলের এই শালযজ্ঞে কার মাথায় উঠবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট? ফুটবলবোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক, সবার মনেই এখন এই এক প্রশ্ন। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, স্কোয়াডের গভীরতা এবং পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিগুলো নিজেদের ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঐতিহ্য, তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার রোমাঞ্চকর মিশ্রণে সাজানো এবারের বিশ্বকাপের হট ফেভারিটদের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনার আলোচনা করা যাক চলুন-
স্পেন
সম্প্রতি বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে নান্দনিক ও কার্যকর ফুটবল খেলে যারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, তারা হলোÑ স্পেন। ইউরো ২০২৪-এর শিরোপা জিতে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা প্রমাণ করেছে, টিকিটাকার সোনালি অতীত পেছনে ফেলে তারা এখন আধুনিক ও গতিময় ফুটবলের নতুন রাজা। ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ফুটবল পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান অপটা সুপার-কম্পিউটারের পূর্বাভাসেও ২০২৬ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে এই ‘লা রোজা’দের।
স্পেনের পুনরুত্থানের মূল চাবি হলোÑ তাদের স্কোয়াডের তারুণ্য। লামিনে ইয়ামাল এবং পেদ্রির মতো তরুণ তুর্কিরা মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে যে সৃজনশীলতার জন্ম দিচ্ছেন, তা যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই দুঃস্বপ্ন। বিশেষ করে ডান প্রান্তে ইয়ামালের গতি ও ড্রিবলিং বিশ্ব ফুটবলে নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছে। তরুণদের এই উদ্যম আর রদ্রি ও কারভাহালের মতো অভিজ্ঞ সেনানায়কদের মস্তিষ্কের মেলবন্ধনে স্পেন এবার খাতা-কলমে এবং সমর্থকদের চোখে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দাবিদার।
ফ্রান্স
গত দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্সকে বাদ দিয়ে ফুটবলের কোনো সমীকরণই মেলানো সম্ভব নয়। ২০১৮-এর চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২-এর রানার্স-আপ ‘লে ব্লুজ’রা এবারও ফেভারিটদের তালিকায় একদম প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। কোচ দিদিয়ের দেশমের অধীনে ফরাসি দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্কোয়াডের অবিশ্বাস্য গভীরতা এবং বড় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। ফরাসি শিবিরের প্রধান সেনাপতি অবধারিতভাবেই কিলিয়ান এমবাপ্পে। বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফরোয়ার্ডের গতি এবং গোল করার ক্ষুধা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের কারণ। এমবাপ্পের পাশাপাশি গ্রিজম্যান, চুয়ামেনি ও দেম্বেলের মতো বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতি ফ্রান্সকে ভারসাম্যপূর্ণ দলে পরিণত করেছে। গত দুই বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ফরাসিরা যদি তাদের চেনা ছন্দ ধরে রাখতে পারে, তবে ২০২৬ সালে তাদের ট্রফি পুনরুদ্ধার করা মোটেও অসম্ভব নয়।
আর্জেন্টিনা
কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের স্বাদ পাওয়া আর্জেন্টিনা এবার নামছে তাদের মুকুট ধরে রাখার কঠিন মিশনে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘আলবিসেলেস্তেরা’। আর এই উন্মাদনার মূল উৎস অবশ্যই মহাতারকা লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসেও দলের প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে মাঠ ও মাঠের বাইরে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। লিওনেল স্কালোনির কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা দলগত রসায়নের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পোস্টের নিচে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, রদ্রিগো ডি পল ও এনজো ফার্নান্দেজের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং হুলিয়ান আলভারেজের আক্রমণভাগের ধার আর্জেন্টিনাকে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ট্রফি ধরে রাখার চাপ থাকলেও, ভক্তদের অকুণ্ঠ সমর্থন আর দলের অটুট বন্ধন আর্জেন্টিনাকে আবারও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ব্রাজিল
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস আর ব্রাজিল যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওরা সবসময়ই ভক্তদের আবেগের অন্যতম বড় জায়গাজুড়ে থাকে। তবে ঐতিহ্য যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সে কিছুটা শিরোপা খরায় ভুগছে ল্যাটিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। ২০০২ সালের পর দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি ব্রাজিলের। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহা, রদ্রিগো এবং এন্ড্রিকের মতো বিশ্বমানের প্রতিভাদের নিয়ে গঠিত ব্রাজিলের আক্রমণভাগ পৃথিবীর যেকোনো রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সাম্প্রতিক খরা কাটিয়ে ব্রাজিল যদি তাদের রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের সমন্বয়হীনতা দূর করতে পারে, তবে উত্তর আমেরিকার মাটিতে তাদের হেক্সা মিশন সফল হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল
থালা-বাসন বা গ্যালারির শোরগোলের বাইরে, ফুটবল প-িতদের মতে শিরোপা দৌড়ে ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল নিঃশব্দে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। জুড বেলিংহাম এবং হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড যেমন যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অভিজ্ঞতা ও ব্রুনো ফার্নান্দেজ-বের্নার্দো সিলভাদের নিয়ে গড়া পর্তুগাল স্কোয়াডও বিশ্বজয়ের সব যোগ্যতা রাখে।

