ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপের যত স্মরণীয় ঘটনা

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাস মানেই হাজারো আবেগ, উত্তেজনা আর আজীবন মনে রাখার মতো কিছু মহাকাব্যিক মুহূর্তের কোলাজ। দেখতে দেখতে আমরা চলে এসেছি ২০২৬ সালের ২৩তম ফুটবল বিশ্বকাপে। এবারের বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে। এবারই প্রথম কাতার বা রাশিয়ার মতো ৩২ দলের গ-ি পেরিয়ে আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল।

ইতিহাসের খাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে উরুগুয়ের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছিল, যেখানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল উরুগুয়ে। ১৯৩০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ২২ বার এই বিশ্বমঞ্চের লড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ বার বিশ্বসেরার মুকুট পরেছে ব্রাজিল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ বার করে জিতেছে জার্মানি ও ইতালি। এ ছাড়া ৩ বার আর্জেন্টিনা এবং ২ বার করে শিরোপা ঘরে তুলেছে উরুগুয়ে ও ফ্রান্স। আর ১ বার করে বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছে ইংল্যান্ড ও স্পেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাস কাঁপানো এমনই ৭টি স্মরণীয় ঘটনা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

ঈশ্বরের হাত (১৯৮৬)

ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা এটি। মেক্সিকোর অ্যাজটেক স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য ড্র। কিন্তু খেলার ৫১তম মিনিটে ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে হেড করার ভঙ্গিতে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন।

খেলোয়াড় থেকে শুরু করে গ্যালারির সবাই বিষয়টি পরিষ্কার দেখলেও তা রেফারি আলী বিন নাসেরের চোখ এড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে ম্যাচ শেষে এক সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা মন্তব্য করেছিলেন, গোলটি হয়েছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাতের সাহায্যে।’ তার আত্মজীবনী ‘এল দিয়েগো’-তেও তিনি এটিকে ‘ঈশ্বরের হাত’ বলে উল্লেখ করেন। এই ঘটনার মাত্র চার মিনিট পরই তিনি ইংল্যান্ডের ৫ জন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে শতাব্দীর সেরা গোলটি করেছিলেন।

মারাকানাজো (১৯৫০)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থবিরতা কাটিয়ে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মাটিতে বসেছিল বিশ্বকাপের চতুর্থ আসর। ঘরের মাঠে শিরোপা জেতার জন্য মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার স্বাগতিক দর্শকের উপস্থিতিতে ফাইনাল সদৃশ শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটি ড্র করলেই চলত, অন্যদিকে উরুগুয়ের প্রয়োজন ছিল জয়। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ফলাফল ছিল ১-১ সমতা। কিন্তু ঠিক তখনই স্তব্ধ মারাকানাকে আরও নিঃশব্দ করে উরুগুয়ের উইঙ্গার আলসিদেস ঘিঘিয়া জয়সূচক গোলটি করে বসেন। ঐতিহাসিক এই ট্র্যাজেডি ব্রাজিলিয়ানদের কাছে মারাকানাজো’ (মারাকানা বিপর্যয়) নামে পরিচিত, যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে আজও এক গভীর ক্ষত।

হার্স্টের বিতর্কিত গোল (১৯৬৬)

নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয় এসেছিল ১৯৬৬ সালে। ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে তারা শিরোপা জিতেছিল। তবে ম্যাচটির অতিরিক্ত সময়ে স্যার জিওফ হার্স্টের একটি গোল নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। ৯০ মিনিটের মূল খেলা ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০১তম মিনিটে হার্স্টের একটি শট ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ঠিক ওপর বা কাছাকাছি ড্রপ খেয়ে বাইরে চলে আসে।

সুইজারল্যান্ডের রেফারি লাইন্সম্যানের সহায়তায় এটিকে গোল ঘোষণা করেন। বলটি আদেও সম্পূর্ণ দাগ পেরিয়েছিল কি নাÑ তা নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিস্তর বিতর্ক চলেছে। আধুনিক যুগে এসে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হয়, বলটির মাত্র ৯৭ শতাংশ দাগ অতিক্রম করেছিল।

জিদানের ঐতিহাসিক ‘ঢুস’ (২০০৬)

২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপের ফাইনালটি ছিল ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। বার্লিনের অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে ইতালি বনাম ফ্রান্সের মধ্যকার সেই হাইভোল্টেজ ফাইনালটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে চরম এক নাটকীয়তার জন্ম হয়। খেলার ১১০তম মিনিটে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে তার বুকে সজোরে মাথা দিয়ে গুঁতা মেরে বসেন জিদান।

রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে জিদানকে মাঠ ছাড়া করেন। বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে জিদানের মাঠ ছাড়ার সেই দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক ও দুঃখজনক ফ্রেম।

ইনিয়েস্তার ‘ফিনিশিং টাচ’ (২০১০)

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচ গোলশূন্য ড্র থাকার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারে রূপ নেবে, ঠিক তখনই ম্যাজিক দেখান আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ম্যাচের ১১৬তম মিনিটে সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত এক শটে নেদারল্যান্ডসের জাল কাঁপান তিনি। এই একটি মাত্র ‘ফিনিশিং টাচ’-এর মাধ্যমে ডাচদের কাঁদিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বজয়ের উল্লাসে মাতে স্পেনের ‘স্বর্ণালি প্রজন্ম’।

সান্তিয়াগো কেলেঙ্কারি (১৯৬২)

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস ও কুৎসিত ম্যাচ হিসেবে পরিচিত ১৯৬২ সালের চিলি বনাম ইতালির গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি। ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই দুই ইতালিয়ান সাংবাদিক চিলিকে অপুষ্টি, অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের দেশ বলে কটূক্তি করলে চিলির সমর্থক ও খেলোয়াড়রা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। মাঠে খেলা শুরুর মাত্র ১২ সেকেন্ডের মাথায় প্রথম ফাউলটি হয়। পুরো ম্যাচজুড়ে লাথি, ঘুষি, থুতু মারা এবং কুৎসিত ফাউলের মহোৎসব চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে বারবার পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। ইংলিশ ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান ম্যাচটিকে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

বিধ্বস্ত ব্রাজিল (২০১৪)

১৯৫০ সালের মারাকানা ট্র্যাজেডির দীর্ঘ ৬৪ বছর পর আবারও ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় ব্রাজিল। হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপা) জয়ের মিশন নিয়ে আসা সেলেসাওরা সেমিফাইনালে বেলো হরিজন্তের মিনেইরো স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় জার্মানির। কিন্তু নেইমারহীন ব্রাজিল সেই ম্যাচে জার্মানির ফুটবল মেশিনের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।

ম্যাচের প্রথম ২৯ মিনিটের মধ্যেই ৫-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ম্যাচটি জেতে ৭-১ ব্যবধানে, যা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ইতিহাসে যেকোনো দলের জন্য সর্বোচ্চ ব্যবধানের পরাজয়। ঘরের মাঠে লাখো ভক্তের সামনে ব্রাজিলের এই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন ও স্মরণীয় বিপর্যয়গুলোর একটি।