প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় পৃথিবী যতটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, ততটাই বদলাচ্ছে আমাদের যোগাযোগ, কাজ ও বিনোদনের ধরন। ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা ইতোমধ্যেই এমন এক সমাজে প্রবেশ করেছি, যেখানে মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য আদান-প্রদান, যাচাই, বিবেচনা করা সম্ভব হচ্ছে। ডিজিটাল রূপান্তরে বিশেষ ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই; যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিশ্বকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে এআই ছাড়াও আরেকটি প্রযুক্তি নীরবে তার অবস্থান শক্ত করছে। জানেন কী, কোন প্রযুক্তির কথা বলছি?
বলছিলাম ভার্চুয়াল দুনিয়া ও মেটাভার্স প্রযুক্তির কথা। একসময় যে প্রযুক্তির কথা শুনলে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হতো, আজ তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ হলো এই ভার্চুয়াল দুনিয়া। অনেকের প্রশ্ন, ভবিষ্যতের এই দুনিয়া আসলে কেমন হবে? এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা কতটা? আবার অনেকে প্রশ্ন করেন, কী কী চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে? চলুন উত্তর খোঁজা যাক
ভার্চুয়াল দুনিয়া
ভার্চুয়াল দুনিয়া বলতে মূলত এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে একটি থ্রিডি স্পেসের মধ্যে মানুষ বাস্তবের মতোই চলাফেরা করতে পারে, কথা বলতে পারে, কেনাকাটা করতে পারে, কাজ করতে পারে। এটি এক ধরনের ‘ডিজিটাল বাস্তবতা’, যেখানে বাস্তব জগতের মতোই অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব, তবে এই প্রযুক্তির সুবিধা হলো, এটি সময়, দূরত্ব বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে মানে না। ভবিষ্যতের ভার্চুয়াল দুনিয়া আরও ইন্টারঅ্যাকটিভ, আরও বাস্তবসম্মত হবে। উন্নত গ্রাফিক্স, সেন্সরভিত্তিক প্রতিক্রিয়া, হ্যাপটিক স্যুট, ৩৬০ ডিগ্রি অডিও এবং এআই-চালিত চরিত্রগুলো এই ভার্চুয়াল দুনিয়াকে আরও জীবন্ত করে তুলবে। বিষয়টা কিছুটা এমন, আপনি হয়তো আকাশে ভাসমান একটি কফিশপে বসে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছেন; কিন্তু সেটি বাস্তবে নয়, বরং আপনার নিজের তৈরি করা একটি ভার্চুয়াল কফিশপে। ঠিক যেমন বাস্তবে চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায়, তেমনি আপনার ডিজিটাল অবতারও সেই অনুভূতি দিতে সক্ষম হবে। এআই এই পুরো পরিবেশকে আরও গতিশীল করবে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর আচরণ, ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, সবকিছুই আরও বাস্তবিক হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের ভার্চুয়াল দুনিয়া তাই কোনো গেম নয়; এটি হবে নতুন ডিজিটাল জীবনব্যবস্থা।
কি কি সুবিধা আনবে?
ভার্চুয়াল রিয়েলিটির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অনুমান করাই যায় যে, এই প্রযুক্তি কী কী সুবিধা আনতে পারে। তবুও চলুন আরেকবার দেখে নেওয়া যাক।
কাজের নতুন জগৎ : ভবিষ্যতের অফিস হবে ভার্চুয়াল। একটি হেডসেট পরেই দূরের সহকর্মীদের সঙ্গে একই রুমে বসে কাজ করা যাবে। কোনো ডেস্ক, কোনো ল্যাপটপের প্রয়োজনও হবে না। এআই-চালিত ভার্চুয়াল ডেস্কটপ সবকিছু সামলাবে। এটি রিমোট ওয়ার্ককে আরও কার্যকর করে তুলবে।
শিক্ষা হবে প্রাণবন্ত : কল্পনা করুন, আপনি ইতিহাস পড়তে পড়তে ব্যাবিলন নগরীর ভেতর দিয়ে হাঁটছেন, এটি শুনতে সিনেমার মতো মনে হলেও ভবিষ্যতে এটি হবে সাধারণ শিক্ষার অংশ। ভার্চুয়াল ক্লাসরুম শেখার পদ্ধতিকে বদলে দেবে। আলাদা দেশে থাকা ছাত্র-শিক্ষক একে অপরকে দেখতে পাবেন, বোঝাতে পারবেন এবং শিখতে পারবেন আগের চেয়ে গতিশীলভাবে।
চিকিৎসায় বিপ্লব : ডাক্তাররা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে থ্রিডি সার্জারি প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন, রোগীরা বাড়িতে বসেই পরীক্ষার প্রাথমিক মূল্যায়ন করাতে পারবেন। এআই রোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক রিপোর্ট দেবে। মানসিক স্বাস্থ্য থেরাপিগুলোতে ভার্চুয়াল পরিবেশ বিশেষ কার্যকর হবে।
বিনোদন : কনসার্ট, সিনেমা, গেমসহ সবকিছুই হবে ইন্টারঅ্যাকটিভ। আপনি শুধু দর্শক নন, বরং অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবেন। প্রিয় শিল্পীর কনসার্টে ‘ফ্রন্ট রো’ সিট উপভোগ করা যাবে বাড়িতে বসেই।
ব্যবসা ও অর্থনীতি : নতুন ধরনের ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস তৈরি হবে। ডিজিটাল পোশাক, ডিজিটাল জমি, ভার্চুয়াল ভবন, সবকিছুর বাজার তৈরি হবে। অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যেই তাদের ‘মেটা অফিস’ তৈরি করছে।
অসুবিধা ও ঝুঁকি
আমরা একটা কথা ভালো করেই জানি, সকল সুযোগের সঙ্গে আসে ঝুঁকি। তাই এই ভার্চুয়াল প্রযুক্তিরও কিছু ঝুঁকি তো থাকবেই। কেমন হতে পারে সেগুলো জানা যাক।
গোপনীয়তার সংকট : ভার্চুয়াল দুনিয়া ব্যবহারকারীর চোখের নড়াচড়া, হাতের ভঙ্গি, শরীরের গতিবিধি ইত্যাদি সব ডেটাই সংগ্রহ করে। এসব ডেটা অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি : অতিরিক্ত ভার্চুয়াল নির্ভরতা বাস্তবজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। সামাজিকতা কমে যাওয়া, আসক্তি বৃদ্ধিÑ এগুলো বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে পারে : উন্নত হেডসেট বা ভার্চুয়াল ডিভাইস সবার সাধ্যের মধ্যে নাও থাকতে পারে। ফলে ডিজিটাল বিভাজন আরও বাড়তে পারে।
নিরাপত্তা সমস্যা : হ্যাকিং, ডিজিটাল প্রতারণা, অবতার চুরি; ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এসব ঝুঁকি আরও বাড়বে।
যদিও ভার্চুয়াল দুনিয়ার জন্য আইন ও নীতিমালা এখনো তৈরি হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, খুব দ্রুত এ বিষয়ে ফয়সালা হবে।
কারা এগিয়ে রয়েছে?
বর্তমানে ভার্চুয়াল দুনিয়ার উন্নয়নে এগিয়ে থাকা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
মেটা (ফেসবুক) : মেটাভার্স ধারণাটিকে বিশ্বের সামনে প্রথম বড় আকারে আনার কারণে তারা এখনো অন্যতম অগ্রগামী।
অ্যাপল : তাদের অ্যাপল ভিশন প্রো ডিভাইস ভবিষ্যতের মিশ্র বাস্তবতার অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
মাইক্রোসফট : হলোলেন্সের মাধ্যমে তারা এন্টারপ্রাইজ সেক্টরে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
গুগল, স্যামসাং, সনি : এরা প্রত্যেকে ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড রিয়েলিটির ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন করছে।
এআই কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ এই প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করছে, কারণ ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাস্তবতা অনেকটাই নির্ভর করছে বুদ্ধিমান এজেন্ট, রিয়েল-টাইম গ্রাফিক্স ও ডেটা প্রসেসিংয়ের ওপর।
সাধারণ মানুষের হাতে কবে পৌঁছাবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ৩-৫ বছরের মধ্যেই ভার্চুয়াল দুনিয়া মূলধারায় ঢুকে পড়বে। এখনো যেসব ডিভাইস দামি ও সীমিত, সেগুলো দ্রুতই সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে। ঠিক যেমন একসময় স্মার্টফোন ছিল বিলাসবহুল, আজ তা সবার হাতে। ভার্চুয়াল দুনিয়াও হবে ঠিক তেমন।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বিষয়টিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। যেখানে আগে একটি ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরি করতে কয়েক মাস লাগত, এখন এআই সেটি কয়েক মিনিটেই তৈরি করে দিতে পারে। ফলে কনটেন্টের অভাব থাকবে না, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও হবে আরও সমৃদ্ধ। ইন্টারনেট যেমন একসময় আমাদের পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই আগামী দশকে ভার্চুয়াল দুনিয়া বদলে দেবে আমাদের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের ধরন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন