গারোদের বিশ্বাস, ‘মিসি সালজং’ বা শস্য দেবতার ওপর নির্ভর করে শস্যের ভালো ফলন হয়। তাই নতুন ফল ও ফসল ভক্ষণের আগে দেবতাকে তুষ্ট করে তারা। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ‘ওয়ানগালা’ উৎসব। নেত্রকোনার ভারতীয় সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে গতকাল শুক্রবার থেকে দুই দিনব্যাপী ওয়ানগালা উৎসব শুরু হয়েছে। জেলার দুর্গাপুরে অবস্থিত বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচালাল একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবের নাম দেওয়া হয়েছে ‘৫০ ড্রাম ওয়ানগালা উৎসব’।
অনুষ্ঠানমালার মধ্যে প্রথম দিনেই ছিল উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচালাল একাডেমির পরিচালক কবি পরাগ রিছিল উৎসবের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আজ (শনিবার) অনুষ্ঠানমালায় থাকছে- থিম সং, রুগালা, সাসাৎ সওয়া ও থক্কা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ৭টি দল অংশগ্রহণ করবে।
গতকাল সকালে অনুষ্ঠানের প্রথমে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। পরে নিজস্ব ভাষায় গান গেয়ে শোনান গারো শিল্পীরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল নতুন ফসল উৎসর্গ ও গারোদের ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ।
উৎসবে নারী-পুরুষরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করেন। কারো মাথায় ছিল কারুকাজ করা ‘খুতুপে’ পাগড়ি, আবার কেউ পরেছিলেন মোরগের পালক দিয়ে বানানো বিশেষ অলংকার ‘দমি’। মাঠজুড়ে সেজেছে অস্থায়ী দোকানও। এতে পাওয়া গেছে আদিবাসীদের নিজের হাতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও খাবার।
ওয়ানগালা গারোদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ‘ওয়ানা’ শব্দের অর্থ দেব-দেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী আর ‘গালা’ শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা। এটি গারোদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। পূজা-অর্চনার মাধ্যমে দেব-দেবীদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও নানা আবেদন-নিবেদন করা হয় এ-উৎসবে। এ-কারণে অনেকেই এটিকে নবান্ন ও ধন্যবাদের উৎসবও বলে থাকে। সাধারণত বাংলাদেশের বৃহত্তর মংমনসিংহ ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো সম্প্রদায় এই রীতিতে বিশ্বাস করে।
ওয়ানগালা উৎসবের নিয়ম অনুসারে জুম খেতের মাঝখানের কিছু অংশের ধান কাটা হয়। ওই স্থানটিকে গারোরা বলে আ’সিরকার স্থান। ধান ঘরে এনে প্রথমে তারা মিসি সালজং বা সূর্যদেবতার নামে মোরগ উৎসর্গ করে। অতঃপর নতুন ধানের চাল দিয়ে ওয়ানগালার জন্য মদ তৈরি করা হয়। এ অনুষ্ঠানের পর সংনি নকমা (গ্রামপ্রধান) সবাইকে ডেকে সভা করে ওয়ানগালা উৎসবের দিন নির্ধারণ করেন। উৎসবের জন্য বাজার থেকে কিনে আনা হয় গরু, শূকর, ছাগল, মোরগ। বাড়ির লোকদের জন্য কেনা হয় নতুন পোশাক ও অলংকারাদি। উৎসবে ব্যবহারের জন্য জোগাড় করা হয় মোরগ ও ডুকুয়া পাখির পালক।
ওয়ানগালার প্রথম দিনের নাম ‘রুগালা’। এ দিনটিতে মূলত উৎসর্গের উৎসব হয়। শস্যের জননী ও ভা-ারদেবী রক্ষিমে, গৃহদেবতা, সূর্যদেবতা ও অন্যদের উদ্দেশে মদসহ উৎসর্গ করা হয় নতুন ধানের ভাত, নতুন ফসলের ফলমূল, শাক-সবজি ও পশু-পাখি। এদিন গরু, শূকর প্রভৃতি মেরে গারোরা সবার মাঝে মাংস বিলি করে।
নকমা (গ্রামপ্রধান) নিকটস্থ ঝরনা বা খাল বা নদী থেকে দুটি কাঁকড়া ধরে এনে একটি পাত্রে রেখে বিভিন্ন আসুষ্ঠানিকতা সারেন। তিনি মিসি সালজং বা সূর্যদেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ ও মন্ত্র পড়ে ভা-ারদেবী ও খাদ্যশস্যের জননী রক্ষিমের পূজা-অর্চনা করেন। ভা-ারদেবীর পর গৃহদেবতার উদ্দেশে মন্ত্র পড়ে মদ ও পানীয় উৎসর্গ করা হয়। ওই দিন দুপুরের পর শুরু হয় ওয়ানগালার অনুষ্ঠান। সালজং বা সূর্যদেবতাকে উদ্দেশ করে মন্ত্র পাঠের পর শুরু হয় রুগালা।
রুগালার রাতে গারোরা নাচ-গান, আমোদ-প্রমোদ করে কাটায়। প্রতিটি বাড়িতে তৈরি হয় পিঠা। যুবক-যুবতীরা খুশিমনে নেচে-গেয়ে পরম্পরকে মদ পান করায়। এ সময় এরা পরম্পরকে আজেয়া, দরোয়া খাবি ইত্যাদি গান দ্বারা প্রশ্ন করে ও উত্তর দেয়।
চয়ন রিছিলের সভাপতিত্বে প্রথম দিনের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন ময়মনসিংহ পিসিসি সংস্থার পরিচালক সিলভেস্টার গমেজ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন- ভূমি মন্ত্রণালয়ের কথাসাহিত্যিক উপসচিব মঈনুল হাসান, বাংলা একাডেমি কবি, পরিচালক, সংস্কৃতি, পত্রিকা ও মিলনায়তন বিভাগের ড. সরকার আমিন, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি ভারপ্রাপ্ত কালচারাল অফিসার মালা আরেং, কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাইযুল ওয়াসীমা নাহাত, শাখা ট্রাইব্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মুকুট স্নাল, সুজিত মানখিন, বুলবুল মানখিন, কপোতি ঘাগ্রা প্রমুখ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন