ঢাকা রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

বললেন ফখরুল

লুটপাটকারীদের ধরেন, কারখানাগুলো চালু থাকুক

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০১:৪৪ এএম

বিএনপি সব সময় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে অর্থনীতিকে। অর্থনীতি সবচেয়ে সচল থেকেছে।’ গতকাল শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫-এ মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে আসলে চিন্তাভাবনাটাও পরিবর্তন করা দরকার। গত ১৫ বছর যারা লুট করেছে, চুরি করেছে, ব্যাংক ডাকাতি করেছে। লুটপাট করে নিয়ে চলে গেছে। তাদের ধরেন, তাদের শাস্তি দেন। তাদের যে ইন্ডাস্ট্রিগুলো, শিল্পকারখানা আছে, সেগুলোতে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে; সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় ১৪ লাখ লোক বেকার হয়ে গেছে। এই লোকগুলো যাবে কোথায়? এই বেকারত্বটা আমরা সৃষ্টি করছি কেন? আমি মনে করি, বিষয়টা আমাদের আবারও ভেবে দেখা উচিত। এই কারখানাগুলো আমরা কীভাবে চালু করতে পারি, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা কীভাবে এই মানুষগুলোর কর্মসংস্থানে সৃষ্টি করতে পারি, সেটা আমাদের দেখা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে বিষয়ের ওপরে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই, সেটা হচ্ছে সাধারণ মানুষগুলো যেন ভালো থাকে। আমাদের কৃষকেরা যেন ভালো থাকে, তার সমস্যার সমাধান যেন করা যায়, আমাদের শ্রমিকেরা যেন তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য পায় এবং অর্থনীতিতে যেন একটা স্থিতি অবস্থা থাকে।’

কৃষকদের ঠিকমতো সার-বীজ পৌঁছাতে পারলে আরও বেশি অর্জন সম্ভব মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা একটা জিনিস খেয়াল করে দেখুন, ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়, সেই সময় বাংলাদেশের তৎকালীন জনগণ ছিল সাড়ে ৭ কোটি; খাদ্যের ঘাটতি ছিল ২৮ লাখ মেট্রিক টন। সেই বাংলাদেশ কিন্তু এখন প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই খাতে আমরা যথেষ্ট অর্জন করেছি।’ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা দরকার এবং শিক্ষা খাতকে আমূল পরিবর্তন করে জনগণের উন্নয়নের উপযোগী করতে হবে বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা।

সংস্কারের প্রস্তাব বিএনপি অনেক আগেই দিয়েছে জানিয়ে দলের মহাসচিব বলেন, ‘২০১৬ সালে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভিশন ৩০ দিয়েছিলেন। আজকে যে বিষয়গুলোতে আমরা একমত হয়েছি, তার অনেকগুলো বিষয় সেখানে কিন্তু ছিল। একই সঙ্গে ২০২৩ সালে আমরা ৩১ দফা দিয়েছি, যার মধ্যে আজকের ইকোনমিক রিফর্ম (সংস্কার), পলিটিক্যাল রিফর্ম প্রায় সবগুলো বিষয় এখানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমরা বাংলাদেশকে সব সময়ই একটা নতুন বাংলাদেশ শুধু নয়, আমরা একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছি।’

একই অনুষ্ঠানে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পথে নিতে হলে ঋণ ও টাকা ছাপানোর প্রবণতা থেকে বের হয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন গ্রাম, শহর, কুটিরশিল্প, ডিজিটাল সেক্টর, স্পোর্টস, কালচারসহ সব খাতের মানুষ অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করবে।’

দেশের গ্রামীণ কারিগর-তাঁতি, কামার, কুমারসহ কুটিরশিল্পের পেছনে সরকারি বিনিয়োগের অভাবে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি। সহজ ঋণ, কাঁচামালের জোগান, স্কিল উন্নয়ন, ডিজাইনিং, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন মার্কেট অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা গেলে এই খাতই বড় অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। গ্রামে বসে অ্যামাজন-ইবের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব, এটাই নতুন অর্থনীতির রূপরেখা, বলেন আমীর খসরু।

ডিজিটাল অর্থনীতি দাঁড়াতে হলে পুরো দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে হবে মন্তব্য করে আমীর খসরু বলেন, ‘এতে কল সেন্টার, ডেটা সেন্টার, অনলাইন রিয়েল-টাইম ব্যবসাÑ সবকিছুই প্রত্যেক মানুষের নাগালে যাবে।’ থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সঠিক সরকারি সহায়তা পেলে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের বিশেষায়িত পণ্য বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারবে।’ স্পোর্টস ও সংস্কৃতি খাতকে বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে স্পোর্টস সেন্টার হবে। খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়, এ-ও একটি বড় অর্থনীতি। মানুষ খেলা দেখতে গেলে সেটাও জিডিপিতে যোগ হয়। একইভাবে থিয়েটার, মিউজিক, ফোক কালচারÑ সবই অর্থনীতির অংশ।’

ব্যাংক-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মার্কেট ক্যাপ জিডিপির মাত্র ৫৬ শতাংশ। ভারতে ১২৫ শতাংশ, আমেরিকায় দ্বিগুণ। উন্নয়ন প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নগর উন্নয়নে ক্যাপিটাল মার্কেটকে কাজে লাগাতে হবে। আইএমএফের পেছনে দৌড়ানোর প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশ ওভার রেগুলেটেড দেশ। সরকারি দপ্তরে ঘোরাঘুরি কমাতে সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থায় সব সেবা আনা হবে।’ দেশের প্রতিটি জেলায় স্কিল সেন্টার গড়ে তুলে তরুণদের দেশ-বিদেশে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের উপযোগী করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।