কড়াইল বস্তিতে ৫ ঘণ্টা টানা ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিঃস্ব হয়েছে হাজার হাজার পরিবার। ১৬ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। সব হারিয়ে নিঃস্ব সেই পরিবারগুলো এই ধ্বংসস্তূপেই খুঁজে নিয়েছে নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর মাধ্যম। গতকাল সরেজমিন মহাখালী বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, সব কিছু হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকা-, পুড়ে যাওয়া জিনিস বেচে ও ধারদেনা করে ফের ঘরবাড়ি তৈরি করে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা তাদের।
এদিন দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে টিন, লোহার পাইপ ও অন্যান্য ধাতব জিনিসপত্র এখন ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা। আগুনে সব হারিয়ে ফেলার পর বেঁচে থাকা সামান্য ধাতবাংশ বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। একই সঙ্গে পরিষ্কার করছেন নিজের দখলে থাকা জায়গা। কড়াইল বস্তির বিভিন্ন গলিতে ঘুরে দেখা যায়Ñ সেখানকার বাসিন্দারা পুড়ে যাওয়া টিন কেটে, ভাঁজ করে ভাঙারি বিক্রেতাদের কাছে তুলে দিচ্ছেন। প্রতি কেজি টিন সর্বোচ্চ ২০ টাকা আর প্রতি কেজি লোহা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা টাকা দরে কিনছেন ভাঙারি ব্যবসায়ীরা। আগুনে সর্বস্ব হারানো কয়েকজন বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত নগদ অর্থ পেতেই তারা ভাঙারি হিসেবে নিজেদের পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র বিক্রি করছেন। সেই টাকায় ফের নতুন এক শুরুর স্বপ্ন বুনছেন সকলেই।
শীতের রাতে কয়েক দিন খোলা আকাশের নিচে বস্তিবাসী :
পুড়ে যাওয়া বস্তির কিছুটা সামনেই ‘বায়তুল মা’মুর জামে মসজিদ’ অক্ষত থাকলেও তার ওপরের টিনের ঘরগুলো পুড়ে ছাই। সেখানেই গত পাঁচ বছর ধরে সাড়ে তিন হাজার টাকায় ভাড়া থাকতেন রাকিব (৩০), যিনি গুলশানের একটি হোটেলের রুটির কারিগর। আগুন লাগার পর পুরো শীতের রাত তাকে কাটাতে হয়েছে গুলশানের রাস্তায় ঘুরে। সকালে আগুন নির্বাপণের ঘোষণা এলে তিনি রুমে আসেন কিছু অবশিষ্ট আছে কি না দেখতে। থাকার কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় এখন গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ যাওয়ার চিন্তা করছেন রাকিব। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আরেক নাইট গার্ড মেজবা বলেন, ‘এই বস্তির অধিকাংশ ভাড়াটিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা থাকার। শীতের রাতে এভাবে বাইরে থাকা কষ্টকর। গত কয়েক দিন সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, এই আগুনের টেনশনে।’
মায়ের শখের সেলাই মেশিনটি আর নেওয়া হলো না; এদিকে কান্নাজড়ির কণ্ঠে রাফি জানান, যখন মেস থেকে তার অবশিষ্ট মালপত্র খুঁজছিলেন, তখন মসজিদের ছাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিচের ধ্বংসস্তূপ দেখছিল দশ বছরের শিশু জিয়ান। কেঁদে কেঁদে সে বলতে থাকে, ‘মায়ের শখের সেলাই মেশিনটি আর নেওয়া হলো না।’ জিয়ানের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস ছিল এই সেলাই মেশিন। মা, বাবা, বোন ও খালা থাকতেন পুড়ে যাওয়া এ ঘরটিতে। আগুন লাগার পর মা শুধু একটি ট্র্যাংক নিয়ে বের হতে পেরেছিলেন। পরে শখের সেলাই মেশিনটি আনতে গেলে আগুনের তীব্রতায় সেটি আর নেওয়া হয়নি। এ শীতের রাতে জিয়ানের ঠাঁই হয়েছে বস্তির সামনে গুলশান লেকের পাশে একটি উঁচু দালানের রাস্তার ধারে। রাতে এক ভবনের লোক খাবার দিলেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক কাপ চা আর রুটি ছাড়া তার কিছুই খাওয়া হয়নি। ‘পুড়ে যাওয়া ঘরে সেলাই মেশিনটির জন্য বেশি কষ্ট হচ্ছে,’ জানাল জিয়ান। ‘এটি যদি বাঁচানো সম্ভব হতো, তাহলে এখন অনেকটা চিন্তামুক্ত থাকতে পারতাম। ঘরে বাবা অসুস্থ, মা এটি চালিয়ে সবার খরচ চালাতেন।’ মধ্যবিত্তের আক্ষেপ, ‘এক জায়গা থেকে নিঃস্ব হয়ে এসেছি, আবার নিঃস্ব হলাম।’ মধ্যবিত্ত পরিবারের সালেহা বেগম (ছদ্মনাম) স্বামীর ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ায় বাধ্য হয়ে ছয় মাস আগে এ বস্তিতে এসে ওঠেন। তিনি বলেন, তাদের এখানে থাকার কথা কোনো আত্মীয়-স্বজন জানে না।
লায়লা বেগম বলেন, আমাদের কপালটাই খারাপÑএক জায়গা থেকে নিঃস্ব হয়ে এখানে আসলাম, আবার এখানে আগুনে নিঃস্ব হলাম। আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের সামনে বসে থাকা লায়লার চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরছিল, যেন তার আফসোসের গল্পের কোনো শেষ নেই। এ আগুন শুধু দেড় হাজার ঘরকে ছাই করেনি, হাজারো মানুষের জীবনের চাকা থামিয়ে দিয়েছে। বারবার ঘটা এ ধরনের অগ্নিকা- কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের জন্য এক স্থায়ী অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোকসানার নিজের দেড় লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। তিনি আরও জানান, ‘বছর দেড়েক আগে এ বস্তির সমস্ত সরকারি গ্যাসের লাইন অবৈধ বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই সবাই সিলিন্ডার ব্যবহার শুরু করে। আগুন লাগার পর এ সিলিন্ডারের কারণেই ক্ষতি বেশি হয়েছে। আগুন লাগার পর একে একে সব সিলিন্ডার বিস্ফোরণ শুরু হয়, যার ফলে আগুনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।’

