× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

বেকার যুবকের হতাশা নয়, হোক সম্ভাবনার জাগরণ : প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

বেকার যুবকের হতাশা নয়, হোক সম্ভাবনার জাগরণ  : প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব

বাংলাদেশ আজ এক বৈপরীত্যের সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিপুল যুব জনসংখ্যা, অন্যদিকে এই যুব সমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্ব, হতাশা ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত। যে তরুণদের হাত ধরে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হওয়ার কথা, তারাই আজ চাকরির অভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে বছরের পর বছর ঘুরেও যখন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে না, তখন অনেক তরুণের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের জন্যও একটি বড় হুমকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক কোটিরও বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বহুবার বলেছে, বাংলাদেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ তখনই কাজে লাগবে, যখন তরুণদের দক্ষ, উৎপাদনশীল ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করা যাবে। অন্যথায় এই বিশাল যুব শক্তিই একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও শ্রমবাজারে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ সৃষ্টি হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, চাকরির বাজারে তার চাহিদা কম; আবার যে দক্ষতার প্রয়োজন, তা শিক্ষার্থীরা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষার সনদ থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য তরুণ কর্মহীন থেকে যাচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে অনেক তরুণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদেরকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। কেউ কেউ মাদকাসক্তি, সাইবার অপরাধ কিংবা সামাজিক অপরাধের পথেও জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভের বহির্প্রকাশ এখন নিয়মিত দৃশ্য। এটি একটি জাতির জন্য অশনিসংকেত।

তবে এই সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার বিশাল দরজা খোলা রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যদি সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পায়, তবে তারাই হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑ এসব খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব এখন দক্ষতাকেই মূল শক্তি হিসেবে দেখছে; বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে।

বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায়। উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের বড় অংশ কারিগরি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করে। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, কৃষি উদ্যোক্তা বা আইটি বিশেষজ্ঞ আজ অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত সনদধারী চাকরিপ্রার্থীর চেয়েও বেশি আয় করছেন। বাস্তবতা বুঝে তরুণদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে।

একইসঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। দেশের অধিকাংশ তরুণ এখনো চাকরির পেছনে ছুটছে, কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস ও সহায়তা খুব কমই পাচ্ছে। সরকার ও ব্যাংকিং খাতের উচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা। কৃষিভিত্তিক শিল্প, স্টার্টআপ, অনলাইন ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পÑ এসব খাতে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেন না; আরও বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেন।

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল অর্থনীতিও তরুণদের জন্য বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসে বাংলাদেশি তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। কিন্তু এ খাতে প্রশিক্ষণ, ভাষাদক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এখনো বড় বাধা। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিটি জেলায় আধুনিক আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে লাখো তরুণ আত্মনির্ভর হতে পারবে।

কৃষি খাতেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। একসময় কৃষিকে শুধু ‘শেষ বিকল্প’ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে আধুনিক কৃষি ও কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অনেক তরুণ সফল হচ্ছেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, অর্গানিক চাষ, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণÑ এসব খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ তরুণদের আয়ের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। শহরমুখী বেকারত্ব কমাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু সরকার নয়, সমাজ ও পরিবারকেও নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমাদের সমাজে এখনো চাকরিকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ফলে তরুণরা বিকল্প পেশায় যেতে ভয় পায়। অথচ বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধারণাই বদলে গেছে। এখন দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে হবে, সাহস দিতে হবে এবং ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখাতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ তরুণদের প্রতি রাষ্ট্রের আন্তরিকতা। শুধু বক্তৃতায় যুব শক্তির প্রশংসা করলেই হবে না; বাস্তব কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে যখন যোগ্য তরুণরা বঞ্চিত হয়, তখন তাদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। তাই নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন না হলে জাতির সম্ভাবনাও ধ্বংস হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণরাই সব বড় পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতান্ত্রিক আন্দোলনÑ সবখানেই যুব সমাজ ছিল অগ্রভাগে। সেই তরুণদের আজ হতাশার অন্ধকারে ডুবতে দেওয়া যায় না। তাদের শক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।

অতএব সময়ের দাবি একটাইÑ বেকার যুবকের হতাশা নয়, হোক সম্ভাবনার জাগরণ। তরুণদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে তারাই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান নির্মাতা। যুব শক্তিকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই; কারণ আজকের তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!