ঢাকা শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

মানসম্মত শিক্ষা কেন অধরা

শাহ সুহেল আহমদ
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৪:৫৮ এএম

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য আমাদের সমাজবোধে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পাস একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানমান আন্তর্জাতিক মানদ-ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সমান। তথ্যটি যেমন আতঙ্কজনক তেমনই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ।

বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে স্বাধীনতার পর একাধিক কমিশন ও সংস্কার হয়েছে। তবে এসব সংস্কার মূলত প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে। পাঠ্যক্রম বদলেছে, বইয়ের রঙ বদলেছে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা বদলায়নি। এখন আমরা এক এমন শিক্ষা ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের মাধ্যম হয়ে পড়েছে। সমৃদ্ধ জ্ঞান ভান্ডার তৈরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা সংকটের শিকড় উপনিবেশিক সময় থেকেই গড়ে ওঠা কাঠামোগত ধারায় নিহিত। ১৮৩৫ সালের ম্যাকলে মিনিট ও পরবর্তী ইংরেজি-বাহিত শিক্ষানীতি উপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য নি¤œস্তরের কেরানি ও প্রশাসনিক কর্মচারী তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়। ব্রিটিশ শাসন শিক্ষাব্যবস্থাকে জ্ঞানসৃজনের বদলে প্রশাসনিক কর্মচারী তৈরির উপকরণে পরিণত করে। পাকিস্তান আমলে ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈষম্যমূলক নীতির কারণে শিক্ষা জনগণের পরিচয়, ভাষা ও বাস্তব চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর মানবিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষার দর্শন প্রস্তাবিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাজারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে জ্ঞানভিত্তিক সাধনার বদলে চাকরিমুখী কাঠামোয় রূপ দেয়। এই তিন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আজকের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল ভিত্তি, মুখস্থনির্ভরতা ও নীতি-অস্থিরতার দুষ্টচক্রে আবদ্ধ করে রেখেছে।

বর্তমানের তথ্যগুলো আমাদের জন্য লজ্জাজনক। টঘঊঝঈঙ ওহংঃরঃঁঃব ভড়ৎ ঝঃধঃরংঃরপং ও ডড়ৎষফ ইধহশ-এর সাম্প্রতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পাঠ-অনুধাবন ও সংখ্যাতত্ত্বে দক্ষতা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤œ তিনের মধ্যে পড়ে। ২০২৩ সালের অঝঊজ (অহহঁধষ ঝঃধঃঁং ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ জবঢ়ড়ৎঃ) জরিপে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণির পাঠ্যবই অনুধাবন করতে পারে না। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান বহু নিচে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানদ-ে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হলো প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ভিত্তি দুর্বল থাকা, ফলে মাধ্যমিকের জটিল পাঠ বুঝতে সক্ষমতা কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং পভার্টি’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে মৌলিক পাঠবোঝা (ৎবধফরহম রিঃয পড়সঢ়ৎবযবহংরড়হ) অর্জন করতে পারে না, যা পরবর্তী শ্রেণিতে শেখার সক্ষমতাকে সরাসরি সীমিত করে। দেশি-বিদেশি গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে প্রাথমিকের স্তরকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমাদের হাল এমক কেন?

এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ ছাত্র-সংখ্যা, সীমিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মুখস্থভিত্তিক ও পরীক্ষা-কেন্দ্রিক পাঠদান, যা চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক মান-সমমান মূল্যায়ন কাঠামোর অভাব বাংলাদেশে জাতীয় শিক্ষালব্ধিকে আন্তর্জাতিক মানে তুলনায় আরো পিছিয়ে দেয়।

এখন প্রশ্ন আসে দেশের শিক্ষকরা কি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না বা পাচ্ছেন না? অবশ্যই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন-দিচ্ছেন। কিন্তু তা চলমান বিশ্বের সঙ্গে মিলছে না। এখানে দায় থেকে যায় দেশের পলিসি ম্যাকারদের। তারা সরকারি খরচায় বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে প্রশিক্ষণ নেন, কিন্তু ফিরে এসে সেই জ্ঞান বাস্তবে শিখিয়ে দিতে ব্যর্থ হন। কারণ এদের সিংহভাগই বিদেশি প্রশিক্ষণ ট্যুরকে মূলত ‘নিজস্ব বিদেশ ভ্রমণ’ হিসেবে মনে করে সময়টাকে ঘুরাঘুরিতেই কাটিয়ে দেন।

বাংলাদেশে সরকারি ব্যয়ে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশেরও কম বরাদ্দ হয়। যেখানে টঘঊঝঈঙ-এর ন্যূনতম সুপারিশ ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত এখনো উদ্বেগজনক: একজন শিক্ষক গড়ে ৬০-৭০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন। শিক্ষাবিদদের মতে- এমন কাঠামোয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

এখানে নৈতিকতার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৈতিকতা বলতে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন বোঝানো হচ্ছে না; বরং দায়িত্বশীল জ্ঞান ব্যবহার, শিক্ষাগত সততা, পেশাগত আচরণবিধি, অন্যের অধিকার স্বীকৃতি, এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার সমন্বিত মূল্যবোধ বোঝানো হচ্ছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তা মানবকল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের হাতিয়ার হতে পারে। মধ্যযুগীয় মুসলিম সভ্যতায় আল-গাজ্জালি, ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের মতো দার্শনিকরা বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মীয় দর্শন, যুক্তি ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, যার ফলেই সেই যুগে বিজ্ঞান জ্ঞানের পাশাপাশি জাগ্রত হয়েছিল মানবিক বোধ। আজকের প্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা ম্যানিপুলেশন, ডিজিটাল নকল ও তথ্যবিকৃতি- এসব নতুন নৈতিক সংকট তৈরি করছে।

এ অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি চিহ্নিত করা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন। প্রথমত, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং শেখার ভিত্তি দৃঢ় করতে হবে, যাতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এসে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানমান আন্তর্জাতিক মানদ-ে প্রতিযোগিতার উপযোগী হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষককে বক্তা নয়, বরং জ্ঞান-অনুঘটক ও মূল্যবোধ নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ, গবেষণা সুযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মুখস্থনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে পরিমাপ করার সক্ষমতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাকে বাজারমুখী দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক, নাগরিক ও নৈতিক গঠনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

লেখক : সম্পাদক- বাংলা টেলিগ্রাম, ফ্রান্স