যশোরের শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গোগা ইউনিয়নের পাঁচভুলাট গ্রাম এবং পুটখালী ইউনিয়নের খলসি ও রাজগঞ্জ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বিশুদ্ধ পানির একমাত্র সরকারি উৎস রাজগঞ্জ বাঁওড় বর্তমানে অবৈধ দখলের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র সরকারি এই বাঁওড় দখল করে মাছ চাষ করছে। ফলে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে তিন গ্রামের মানুষের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।
এলাকাবাসী জানান, একসময় এই অঞ্চল ছিল আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকার মধ্যে অন্যতম। নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক থাকায় হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ছিলেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক’ কয়েক বছর আগে স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে।
প্রকল্পের আওতায় ইছামতি নদী থেকে প্রবাহিত পুটখালী বাঁওড়ের একটি অংশকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পুটখালী বাঁওড়ের শেষ অংশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে খলসি, পাঁচভুলাট ও রাজগঞ্জ এলাকার সংরক্ষিত জলাধার গড়ে তোলা হয়। পরে সেখানে একটি পানি শোধনাগার ও ট্যাংক স্থাপন করা হয়। বাঁওড় থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের মাধ্যমে পাইপলাইনে তিন গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় থেকেই বাঁওড়ের ওই অংশে মাছ চাষ ও অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যাতে পানির বিশুদ্ধতা বজায় থাকে। কিন্তু বর্তমানে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেখানে মাছ চাষ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নিয়মিতভাবে বাঁওড়ে রাসায়নিক সার, জৈবসার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
পাইপলাইনের পানি ব্যবহারকারী কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানান, আগে বাঁওড়ের পানি তুলনামূলক স্বচ্ছ ও নিরাপদ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পানির মান নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আবারও আর্সেনিকসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, ‘এই বাঁওড়ের পানি আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে মাছ চাষ করে হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছেন। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।’
আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা মাসিক টাকা দিয়ে এই পানির ব্যবস্থা সচল রাখছি। কিন্তু এখন সেই পানির উৎসই ঝুঁকির মধ্যে। দ্রুত বাঁওড়টি দখলমুক্ত করা না হলে আমরা বিপদে পড়ব।’
জানা গেছে, তিন গ্রামের পানির সরবরাহব্যবস্থা পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে তিনটি সেবামূলক সমিতি রয়েছে। পাইপলাইন সংযোগধারী পরিবারগুলো মাসিক পাঁচ টাকা করে জমা দেন। ওই অর্থ বিদ্যুৎ বিল, মোটর পরিচালনা, পাইপলাইন সংস্কার ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যয় করা হয়।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা বলেন, ‘পুটখালী বাঁওড়ের একটি অংশ তিন গ্রামের মানুষের বিশুদ্ধ পানির জন্য সংরক্ষিত। সেখানে মাছ চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন এবং অবৈধ দখলমুক্ত করা জরুরি।’
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, ‘সরকারি জলাশয় অবৈধভাবে দখল করে মাছ চাষের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বার্থের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি এই বাঁওড়টি দ্রুত দখলমুক্ত করে উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং সেখানে সবধরনের বাণিজ্যিক মাছ চাষ বন্ধ করতে হবে। তাদের মতে, এতে তিন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বিশুদ্ধ পানির উৎস রক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হবে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সরকারি এই বাঁওড় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি জনসাধারণের সম্পদ। তাই জনস্বার্থে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

