নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় ৫০ কোটি টাকার জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে ‘এসিআই সল্ট’ নামের একটি লবণ কোম্পানি। অভিযোগ রয়েছে, পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাব খাটিয়ে এই জমি দখল করে কোম্পানিটি। তা ছাড়া লবণ উৎপাদনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে পানিদূষণসহ কারখানার ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাস ও লবণাক্ত বর্জ্য আশপাশের জমিতে মিশে গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ। ওই এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্তসহ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য।
বছরের পর বছর এভাবে চলতে থাকলেও প্রতিকারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এ কারণে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। তবে, পরিবেশদূষণ ও নানা অব্যবস্থাপনার দায়ে সম্প্রতি কারখানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও তৎকালীন রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারিকুল আলম। তিনি বলেন, কারখানাটি শীতলক্ষ্যা নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলছে এবং পাউবোর জমি দখল করে রেখেছে। অভিযানে তার প্রমাণও মিলেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আইন (২০০০) অনুযায়ী পাউবোর মালিকানাধীন কোনো জমি বা সম্পদ অবৈধভাবে দখল করা বা তাতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের অপরাধের জন্য দখলদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি সম্পত্তি দখল (পুনরুদ্ধার) অধ্যাদেশ, ১৯৭০ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে, তাহলে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। পাউবোর সম্পত্তিও একই আইনের আওতাভুক্ত। তবে পাউবোর জমি উদ্ধারে কেন কার্যকর ভূমিকা নেই, সে প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে পাউবোর প্রায় সাত বিঘা (২২১ শতাংশ) জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে এসিআই নামের লবণ কারখানাটি। ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের প্রভাব খাটিয়ে কারখানার জমি দখল করে কোম্পানিটি।
এদিকে কারখানার লবণাক্ততার কারণে স্থানীয়দের ঘর-বাড়ির টিনের চালা নষ্ট হচ্ছে, জমির উর্বরতা কমে গিয়ে ফসলহানি এবং নদীর পানি দূষণের কারণে মাছ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই জনস্বাস্থ্য। বছরের পর বছর এভাবে চলতে থাকলেও প্রতিকারের কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকায় ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।
ওই কারখানার পাশেই পরিবার নিয়ে বসবাস করেন দিল মোহাম্মদ। তিনি জানান, আমার বাড়ির টিনের চাল এক বছরের মধ্যে ক্ষয় হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। প্রতি বছর আমাকে নতুন টিন কিনতে হয়। কারখানার ধোঁয়া এতটাই ঝাঁজালো যে আমরা ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারি না। ছোট ছেলেমেয়েদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা লেগেই আছে। এসিআই লবণ কারখানার কারণে সাবমারসিবলের পানিও লবণাক্ত হয়ে গেছে।
জান্নাতি আক্তার জিম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, রান্না করার সময় বা বাইরে কাপড় শুকাতে দিলে কাপড়গুলো কেমন জানি তেলতেলে আর কালো হয়ে যায়। রাতে ঘুমানোর সময়ও একটা বাজে গন্ধ আসে। আমরা কারখানাকে কোনো দোষ দিই না, তবে মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়গুলোও তাদের মনে রাখা উচিত। মঙ্গলখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হুমায়রা বেগম বলেন, এসিআই লবণ কারখানার কারণে স্কুলের ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত হয়ে গেছে। সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে পানি তুলেও সেই পানি পান করা যাচ্ছে না। পানি লবণাক্ত হওয়ায় স্কুলের ৪০০-৫০০ শিক্ষার্থী তীব্র পানিসংকটে ভুগছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
জানতে চাইলে এসিআই সল্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপক নিয়ামুল বাড়ি বলেন, টুকটাক কিছু সমস্যা থাকবেই। এমন কোনো ইন্ডাস্ট্রি নাই, যেখানে টুকটাক সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা কীভাবে সমাধান করে আমরা চলতে পারি, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ ছাড়া, পাউবো থেকে বৈধভাবে জমি লিজ নিয়েছেন। তবে দাবির সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কাগজপত্র দেখাতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এসিআই সল্ট কারখানায় ইতিমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশদূষণ ও নানা অব্যবস্থাপনার দায়ে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এইচ এম রাশেদ বলেন, এসিআই সল্ট কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণ এবং বর্জ্য অব্যবস্থাপনার গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি অভিযানে কোম্পানিটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তাদের ১১ বছর ধরে পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন না করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারখানাটিতে ইটিপি প্ল্যান্ট থাকা সত্ত্বেও সেটি ব্যবহার না করে সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ আইন অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ।
নারায়ণগঞ্জ পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল আলম রাজিব বলেন, ‘এসিআই সল্ট লবণ কোম্পানিটি লিজের দাবি করলেও লিজের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে এবং পাউবোর জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ আইন পরিপন্থি। আমরা সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন সরকারি সার্ভেয়ার দেওয়া হয়েছে। দু-তিন দিনের মধ্যে আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন