রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


মো. আরাফাত, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০২:১২ এএম

মাঠে মাঠে শুঁটকি, ঘাটে ঘাটে ব্যস্ততা

মো. আরাফাত, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০২:১২ এএম

মাঠে মাঠে শুঁটকি, ঘাটে ঘাটে ব্যস্ততা

  • আনোয়ারায় রাসায়নিক ছাড়া অর্গানিক শুঁটকি উৎপাদন
  • ঘাটে প্রতিদিন কয়েক হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা
  • রোদে ৩-৭ দিনে শুঁটকি প্রস্তুত ও দেশ-বিদেশে সরবরাহ
  • সরকারি তদারকিতে বাড়ছে উৎপাদন ও রপ্তানি

শীতের নোনামাখা হাওয়া বইছে উপকূলে। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে সারি সারি মাছের ডালা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সাগরের বুকে কেউ যেন রঙিন চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় ফকিরহাট, ঘাটকুল ও উঠান মাঝির ঘাট এখন যেন এক জীবন্ত কর্মচাঞ্চল্যের পল্লি, যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলতে থাকে শুঁটকি প্রস্তুতের ব্যস্ততা।

সরেজমিনে ঘাটে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে শত শত মানুষ কাজ করছেন নিরলসভাবে। কেউ জালে ধরা মাছ বাছাই করছেন, কেউ চিংড়ি ঝেড়ে ময়লা আলাদা করছেন, কেউবা সূর্যের তাপে শুকানোর জন্য মাচায় টাঙিয়ে দিচ্ছেন কোরাল, সুরমা, লইট্টা, পোপা বা চিংড়ি মাছ। ছোট ছোট মেয়েরা বালতির পাশে বসে মাছ আলাদা করছে, আর পাশে থাকা নারী শ্রমিকেরা শুকনা মাছগুলো বস্তায় ভরছেন। চারপাশে কেবল মাছ, রোদ, বাতাস আর মানুষের পরিশ্রমের গন্ধ; এ যেন এক ভিন্ন জগত।

ফকিরহাটের শুঁটকি শ্রমিক মো. ইউসুফ (৪০) বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করি। একেক দিন ৬০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত পাই। কঠিন কাজ, কিন্তু এই টাকাতেই ঘর চলে, ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিতে পারি। শীতের সময়টাই আমাদের মৌসুম, এই সময়টাতেই সারা বছরের আয় করতে হয়।’

উঠান মাঝির ঘাটের জেলে আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা সকালেই সাগরে যাই, মাছ ধরে বিকেলে এনে দিই আড়তে। কেউ মাছ বিক্রি করে দেয়, কেউ আবার শুকানোর কাজেও লাগে। রোদ থাকলে ভালো শুঁটকি হয়, কিন্তু বৃষ্টি হলে সব নষ্ট হয়ে যায়। তবুও এই কাজেই আমাদের জীবন।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, ‘আগে শুঁটকি শুকানোর সময় দুর্গন্ধে থাকা যেত না। এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে, পরিষ্কারভাবে কাজ হয়। প্রশাসনও নজর রাখে।’

ঘাটকুল এলাকার নারী শ্রমিক রেহানা আক্তার বলেন, ‘আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতাম। এখন শুঁটকি ঘাটে কাজ করি, আয়ও ভালো হয়। রাসায়নিক ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে শুকানো হয়, তাই ক্রেতারাও খুশি থাকে। সরকারের একটু সহযোগিতা পেলে আরও ভালোভাবে কাজ করা যেত।’

ঘাটজুড়ে এক অনন্য আবহ তৈরি হয়েছে। রোদে শুকানো মাছের সারি, প্লাস্টিকের ওপর বিছানো ছোট-বড় মাছের স্তূপ, পাশে বসে হাসি-ঠাট্টায় মগ্ন শ্রমিকরা। শুকানো শেষে ড্রাম, লাই বা বস্তায় ভরে ট্রাকে করে পাঠানো হয় এসব শুঁটকি চট্টগ্রামের চাক্তাই, রাজধানী ঢাকা, নোয়াখালী, সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্তে। এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এই মুখরোচক অর্গানিক শুঁটকি।

শুঁটকি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে প্রায় দুই-তিন হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করে। আমাদের একেকটা প্লটে ৩০-৩৫ জন শ্রমিক থাকে। একেক ডালায় খরচ হয় লাখ টাকার বেশি, তবে লাভও হয় লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। রাসায়নিক কিছুই দিই না, পুরোপুরি প্রাকৃতিকভাবে শুকানো হয়। এ কারণেই দেশের বাইরে পর্যন্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে।’

ফকিরহাট শুঁটকিমহালের মালিক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘রোদে শুকানো শুঁটকি সবচেয়ে ভালো মানের হয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন থেকে পাঁচ দিনেই শুকানো যায়, বড় মাছ শুকাতে লাগে সাত দিন পর্যন্ত। আমরা কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করি না, তাই বাজারে ভালো দাম পাই।’

উঠান মাঝির ঘাটের পাইকারি মাছ বিক্রেতা নুরুল ইসলাম জানান, ‘আমরা সাগর থেকে চিংড়ি, কোরালসহ নানা প্রজাতির মাছ এনে মহালে বিক্রি করি। শুঁটকি তৈরি হলে চাক্তাইয়ের বাজারে বিক্রি হয়। এক সপ্তাহে একটি মহাল থেকে চার-পাঁচ মণ শুঁটকি বিক্রি হয়।’

আড়ৎদাররা বলছেন, বাজারে আনোয়ারার শুটকি খ্বুই নাম-ডাক ছড়াচ্ছে। চাক্তাইয়ের শুঁটকি আড়তদার আবদুল জলিল জানান, ‘আনোয়ারার শুঁটকি এখন বাজারে আলাদা নামেই বিক্রি হয়। কারণ এগুলো অর্গানিক ও গন্ধে মিষ্টি। বিদেশে প্রবাসীদের কাছেও খুব জনপ্রিয়। প্রতি বছরই আনোয়ারার শুঁটকি বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে।’

আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাশিদুল হক বলেন, ‘গত বছর আনুমানিক ৩৫০ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর আমরা আশা করছি তা ৫০০ টন ছাড়াবে। আমাদের টিম নিয়মিত মাঠে গিয়ে জেলেদের সচেতন করছি যেন কেউ ডিডিটি পাউডার বা কীটনাশক ব্যবহার না করে। ইতোমধ্যে ২০০ জন জেলেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষমুক্ত শুঁটকি শুধু স্বাদেই ভালো নয়, এটা স্বাস্থ্যসম্মতও। ভবিষ্যতে আনোয়ারার শুঁটকি রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার  বলেন, ‘শুঁটকি শিল্প আনোয়ারার একটি ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাময় খাত। উপজেলা মৎস্য অফিস নিয়মিতভাবে ঘাটগুলো তদারকি করছে।  কেউ অবৈধ রাসায়নিক ব্যবহার করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  এ ছাড়া সরকারিভাবে জেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’

দিনশেষে যখন সূর্য ধীরে ধীরে সাগরের বুকের ভেতর ডুবে যায়, তখনো ঘাটে বাতাসে ভেসে আসে মাছ শুকানোর গন্ধ। শ্রমিকরা তখনো ব্যস্ত; কেউ বস্তা বেঁধে রাখছে, কেউ শেষ আলোয় চিংড়ির ডালা গুনছে। এ যেন এক অনন্ত পরিশ্রমের প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবন, সমুদ্র আর স্বপ্ন মিশে গেছে একাকার।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!