রাজশাহীর কাকনহাট পৌরসভায় ছয় পদে নিয়োগে কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী এবং অভিভাবকরা। নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের ঘটনায় তৎকালীন মেয়র আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য একেএম আতাউর রহমান খান এবং পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিমের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ ঘটনায় শাহরিয়ার সবুজ নামে এক চাকরিপ্রত্যাশী আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন চাকরিপ্রত্যাশী একজন প্রার্থী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর কাকনহাট পৌরসভায় একজন করে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, স্টোর কিপার, সহকারী কর আদায়কারী, সার্ভেয়ার, নি¤œমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এ সময় ছয়টি পদে ১৩০ জন আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৯১ জনকে বৈধ প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এরপর অতিদ্রুততার সঙ্গে ২৯ ডিসেম্বর লিখিত এবং পরের দিন মৌখিক পরীক্ষার দিন ধার্য করা হয়। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ঘুস ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালেই ২১ ডিসেম্বর সহকারী কর আদায়কারী পদের চাকরি প্রার্থী সানজিদা শেখ রাজশাহীর জেলা প্রশাসক বরাবর নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেন নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। একই ঘটনায় তিনি ২৬ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন।
এ সময় সানজিদা কারা নিয়োগ পাবেন সে বিষয়েও করেন ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি স্টোর কিপার পদে মেয়রের নাতি শিহাব উল্লাহ, সহকারী কর আদায়কারী পদে মহাসিনা আক্তার, সার্ভেয়ার পদে ইফতেহাদ আহম্মেদ স্বপন, কম্পিউটার অপারেটর পদে হিমেল এবং অফিস সহায়ক পদে মেহেদী হাসান নিয়োগ পাবেন বলে দাবি করেন।
এ পরিস্থিতিতে ২৭ ডিসেম্বর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ এবং সংবাদ সম্মেলন করার কারণে তৎকালীন মেয়রের নাতি শিহাব উল্লাহ চাকরি প্রার্থী সানজিদার বাবা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর গোলাম মোর্তুজা শেখকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ ঘটনায় মোর্তুজা ২৬ ডিসেম্বর শিহাবসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণে ডায়েরি করেন।
এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গত বছরের ১২ জুলাই স্থগিত নিয়োগ প্রক্রিয়া আবার শুরু করা হয়। দ্রুততার সঙ্গে দুদিনের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে ১৪ তারিখেই নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের যোগদানপত্র দেওয়া হয়। তবে সাত মাস পরেও নিয়োগের বিষয়ে ছয়টির মধ্যে চারটি পদেই সানজিদার লিখিত অভিযোগ এবং সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা ভবিষদ্বাণী মিলে যায়। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ পান আসাদুল ইসলাম, স্টোর কিপার পদে শিহাব উল্লাহ, সহকারী কর আদায়কারী পদে মহাসিনা আক্তার এবং সার্ভেয়ার পদে ইফতেহাদ আহম্মেদ স্বপন নিয়োগ পেয়েছেন। তবে কম্পিউটার অপারেটর পদে শিহাব উদ্দিন এবং অফিস সহায়ক পদে শরিফুল ইসলাম নামের অন্য দুজন নিয়োগ পান।
চাকরি প্রার্থী সানজিদা শেখের বাবা গোলাম মোর্তুজা শেখ বলেন, ‘স্টোর কিপার পদে শিহাব উল্লাহ চাকরি পেয়েছেন। তিনি মেয়রের নাতি। এ কারণে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। বাকি পাঁচটি পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা করে নিয়েছেন তৎকালীন মেয়র একেএম আতাউর রহমান খান এবং পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম। এর মাধ্যমে এই দুই ব্যক্তি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’
তবে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৎকালীন মেয়রের নাতি শিহাব উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মেধার ভিত্তিতেই আমার চাকরি হয়েছে।’ এছাড়া স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে এবং সহকারী কর আদায়কারী পদে চাকরি পাওয়া আসাদুল হক ও মহাসিনা আক্তার বলেন, ‘টাকা দিয়ে আমরা চাকরি পাইনি। এসব নিয়ে মামলা ও দুদকে অভিযোগ হয়েছে। আমরা চরম মানসিক অশান্তিতে রয়েছি।’
এদিকে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ছাড়াও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। পৌরসভার সদ্যসাবেক আট কাউন্সিলর গত বছরের ১৪ আগস্ট দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় রাজশাহীর উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তিনটি পদে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীরা জাল সনদ দাখিল করেছেন। আর এসব জাল সনদ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করেছেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম।
পৌরসভার তৎকালীন প্যানেল মেয়র-১ আল-মামুন বলেন, ‘নিয়োগে চরম অনিয়ম, অর্থ লেনদেন এবং স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে পৌরসভার কাউন্সিলররা কয়েক দফা আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের আপত্তি আমলে নেননি আতাউর রহমান খান। তারা নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে গত দুই মাস আগে রেজাউল করিম বদলি হয়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভায় স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে চলে যান। আর আত্মগোপন করেন আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমার কোনো পছন্দের প্রার্থী ছিল না। আর টাকার বিনিময়ে জাল সনদ সংগ্রহের অভিযোগটিও বানোয়াট।’
দুদক সমন্বিত কার্যালয় রাজশাহীর সহকারী পরিচালক আমির হুসাইন বলেন, ‘অভিযোগ তদন্তের অনুমোদন পাওয়া গেছে। অচিরেই অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা হবে। কোন অনিয়ম হলে ব্যবস্থা হবে।

