ফল ও সবজি উৎপাদনে বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলার, যা এ জেলার কৃষির মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও ধরা হয়। অথচ জেলার চার উপজেলায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩২টি জৈব ও ভার্মি কম্পোস্ট কারখানা। বিস্ময়কর হলেও সত্যÑ এসবের মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে মাত্র ৫টি। বাকি কারখানাগুলো বছরের পর বছর ধরে সরকারি অনুমোদন ও নিয়ম-নীতি ছাড়াই অবাধে সার উৎপাদন করছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ অনিয়ম। এসব নিবন্ধনহীন কারখানায় উৎপাদিত নি¤œমানের সার দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে এসিআই, ব্র্যাক, নাজীমসহ নামি-দামি কোম্পানির বস্তায়। অর্থাৎ কারখানার ভিতরে যেটা তৈরি হয়, বাজারে সেটাই পৌঁছাচ্ছে ভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে, ভিন্ন পরিচয়ে। সাধারণ চোখে তেমন কিছু ধরা না পড়লেও আসল রহস্য জানলে মনে হবেÑ এ যেন ব্র্যান্ডিংয়ের আড়ালে প্রকাশ্য প্রতারণা।
একদিকে কারখানাগুলোর নেই সরকারি অনুমোদন, অন্যদিকে নেই গুণগত মান পরীক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থাও। ফলে এসব জৈব সার আসলে কতটা কার্যকর বা কৃষিজমির জন্য ক্ষতিকর কিনা তা জানার উপায় নেই। এই অরাজকতার দায় কারখানা মালিকদের পাশাপাশি নজরদারি না করায় প্রশাসনের ওপরও বর্তায়।
কারখানা মালিকদের একাংশের দাবি, লাইসেন্স না পাওয়ায় উৎপাদিত সার সরাসরি বাজারজাত করা সম্ভব হয় না; তাই নামি-দামি কোম্পানিগুলো চুক্তি করে তাদের সার কিনে নিয়ে নিজের নামে বিক্রি করে। তবে এ দাবি থেকেই স্পষ্ট যে, নামি-দামি কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত ছাড়া এমন বিস্তৃত অবৈধ বাণিজ্য সম্ভব হতো না।
কৃষকদের নিয়ে কাজ করা একটি এনজিও কর্মী ও কৃষক সংগঠনের নেতা বলছেন, লাইসেন্সবিহীন এবং মানহীন এই সার ব্যবহারে দেশের কৃষক সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে ভালো ফলনের আশায় কৃষকরা যেমন না বুঝে এসব জৈব সার কিনছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে তা প্রয়োগ করে কোনো ফলই পাচ্ছে না। ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জমিরও ক্ষতি হচ্ছে।
আবার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনকে জানালেও তেমন কোনো ফল পওয়া যায় না। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো দু-একটা অভিযান চালিয়ে মালিককে জরিমানা করে দায় সারেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলছে, তা দেখার দায়িত্ব কার? লাইসেন্স ছাড়া কারখানা চালু রেখে বড় বড় ব্র্যান্ডের নামে সার বাজারজাত করার মতো বড় ধরনের বাণিজ্যিক দুর্নীতি কিভাবে এতদিন অদৃশ্য থাকে?
সচেতনমহল মনে করেন, জৈব সার শিল্পকে সঠিক পথে আনতে হলে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, উৎপাদন মান নিশ্চিত করা এবং বড় কোম্পানিগুলোর অস্বচ্ছ ক্রয়-বিক্রয় নেটওয়ার্কের ওপর কঠোর নজরদারি দরকার। না-হলে কৃষি খাতের এই অস্বচ্ছ বাণিজ্য আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করবে।
কৃষক জোটের সেক্রেটারি শাহাজাহান আলী বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার অধিকাংশ জৈব সার কারখানাই লাইসেন্সবিহীন। মান নিয়েও বড় প্রশ্ন আছে। অথচ এসব কারখানার সার ভিন্ন কোম্পানির মোড়কে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষক উপকৃত হয় না, বরং প্রতারিত হয়।
কৃষকদের নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘রিসো’র নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, যেহেতু এসব সার দেশের নামি-দামি ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সারাদেশে বিক্রি হচ্ছে, তাই কারখানাগুলোর বৈধ কাগজপত্র ও মান যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, জেলায় মাত্র ৫টি কারখানার লাইসেন্স থাকলেও বেশ কয়েকটি কারখানা অনুমোদন ছাড়ায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। ওই সব কারখানায় অনিয়ম হচ্ছে বলে খবর পওয়া গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

