ঢাকা শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

ভুলে যাইনি ভ্যালির কথা

মেহরুন নিশি
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৫:০২ এএম

সাজেক ভ্যালির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মায়াবি উপত্যকা। শুভ্র মেঘের চাদরে মোড়া, পাহাড়ের কোল বরাবর নরম রৌদ্রের খেলাঘর, প্রকৃতির নৈঃশব্দ্যে হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নরাজ্য হলো সাজেক। অনেকদিন ধরেই আলোচনায় নেই সাজেক ভ্যালি, নতুন নতুন পর্যটন স্পটের ভিড়ে যেন একটু আড়ালেই চলে গেছে মায়াবি এই ভ্রমণগন্তব্য। কিন্তু সত্যিই কি সাজেক ভ্যালিকে ভুলে যাওয়া যায়? না, যায় না। যারা একবার গেছেন তারা জানেন, সাজেক এমন এক অনুভূতির নাম, যা ভ্রমণের স্মৃতির অ্যালবামে চিরকালই বিশেষ জায়গা দখল করে থাকবে।

কেউ তাকে বলে মেঘের দেশ, কেউ বলে মেঘবালিকা। কখনো বা মেঘের রাজ্য। নাম যাই হোক, সাজেকের রূপ-যৌবনে কোনো ভাটা নেই। সময় যত যাচ্ছে, সাজেক যেন নিজের সৌন্দর্যকে আরও নতুনভাবে সাজিয়ে তুলছে। বিশেষ করে শীতে সাজেক ভ্যালি হয়ে ওঠে অন্য এক জগৎ। ভোরের আলো ফুটতেই দেখা যায় উপত্যকার বুকজুড়ে নেমে এসেছে কুয়াশার নরম চাদর, পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা মেঘগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসে গ্রামের পথ পর্যন্ত। মনে হয়, মেঘের ভেলায় চড়ে চলে যাচ্ছে পাহাড়ের ছায়ারা। সাজেকের সৌন্দর্যের বিশেষত্ব হলো এর বৈচিত্র্য। মাটির পাহাড়ের রেখাগুলো সবুজ বস্ত্রে মোড়া।  যেখানে সূর্যের আলো পড়ে রঙ বদলায় প্রতি ক্ষণে। উপত্যকার চারদিকে ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলো প্রকৃতির কোলে থাকা এক মোহনীয় আদিবাসী জীবনযাপনের ছবিও দেখায়। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, পূর্বে মিজোরাম, দক্ষিণে লংগদু এবং পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা। চারদিকে সীমান্তবেষ্টিত হওয়ায় এখানকার ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া আলাদা একটা জাদু সৃষ্টি করে। শীতকাল হল সাজেক ভ্রমণের সেরা সময়গুলোর একটি। গরমে ভ্রমণে রোদের তাপে ক্লান্তি এসে যায় সহজেই। কিন্তু শীতে পরিবেশ থাকে নির্মল। শীতের সাজেক যেন একেবারেই অন্য সাজেক। মেঘের ভেলায় ভাসা ভোর, রোদ মাখা দুপুর, কুয়াশা-ঢাকা সন্ধ্যা, আর সঙ্গে রয়েছে তারাভরা রাত। পাহাড়, আকাশ ও মাটি মিলে যে সমন্বয় সৃষ্টি করে, তা চোখ দিয়ে দেখলে মনেও গেঁথে থাকে।

সাজেকের সকালের সৌন্দর্য নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। সাজেকের ভোরবেলায় যখন ধূসর কুয়াশার গায়ে প্রথম আলোর রং লাগে, তখন মনে হয় অপ্সরীরা হয়তো মেঘের পোশাক পরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে। এই দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা চলে না অন্য কিছুরই। বিদেশের বরফঢাকা উপত্যকাগুলো, যেমন কাশ্মীর, সিমলা, মানালি কিংবা সিকিমের ইয়ামথাং ভ্যালির সৌন্দর্যের কথা আমরা প্রায়ই শুনি। সেখানে শীতে বরফই প্রধান আকর্ষণ। আমাদের দেশে বরফ না পড়লেও সাজেকের মেঘ আর কুয়াশার জাদু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে দাঁড়িয়ে যায় সেইসব উপত্যকার পাশাপাশি। কখনো তাদের ছাড়িয়ে। শীতকালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাজেক পরিবর্তন করে তার রূপ। সকালে মেঘ থাকলেও দুপুরে সেখানে নেমে আসে ঝলমলে রোদ, উঁচু পাহাড়গুলো তখন দাঁড়িয়ে থাকে দিগন্তজোড়া নীল আকাশের নিচে। সন্ধ্যা হলে কুয়াশা আবার ফিরে আসে, যেন উপত্যকা দিনশেষে আবার আপন নিবাসে ফিরে যায়। দিনের সাজেকের চেয়ে রাতের সাজেক একেবারেই অন্য রকম। শীতের রাতে পরিষ্কার আকাশে দেখা যায় অসংখ্য তারা। দেখে মনে হবে যেন পাহাড়ের ক্যালেন্ডার জুড়ে ছড়ানো আলোকবিন্দু। শীতকাল চলেই এলো প্রায়। এই সময়টা ভ্রমণের জন্য খুবই উপযুক্ত। হাতে সময় থাকলে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন সাজেকের উদ্দেশ্যে।

যা দেখবেন

সাজেকে ঘোরার মূল আকর্ষণ পাহাড়ি রাস্তা আর মেঘের খেলা। তবে এর বাইরেও কিছু নির্দিষ্ট স্পট রয়েছে যা ভ্রমণকে নিখুঁত করে তোলে।

কংলাক

সাজেক ভ্রমণের বিশেষ আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কংলাক পর্বত। এখান থেকে সাজেক ভ্যালিকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে। সারি সারি পাহাড়ের ঢেউ, নিচে গ্রামীণ বসতি, ওপরে মেঘ। প্রকৃতির এই মায়াজালের সামনে দাঁড়িয়ে সময়কে ভুলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

রুইলুই পাড়া

সাজেকের স্থানীয় অধিবাসী পাংখোয়া ও লুসাই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির কাছাকাছি যেতে চাইলে রুইলুই পাড়া ঘুরে দেখতে পারেন। তাদের জীবনযাপন, পাহাড়ি ঘর, নিজস্ব শিল্প মনোমুগ্ধকর অনুভূতি দেবে।

হেলিপ্যাড ভিউ পয়েন্ট

সাজেক ভ্রমণের জনপ্রিয় জায়গা এটি। সূর্যাস্ত হোক বা সূর্যোদয়, হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন দিগন্তজোড়া পাহাড় ও সবুজের উৎসব।

দুর্গম পাহাড়ি পথের দৃশ্য

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পুরো পথটাই একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, নীল আকাশ আর দু’পাশে অনন্ত সবুজের মাঝে যাত্রা ভোলার মতো নয়।

যেভাবে যাবেন

সাজেক ভ্যালি যেতে হলে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে খাগড়াছড়ি অথবা দীঘিনালা। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের নন-এসি ও এসি বাস সার্ভিস পাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা হয়ে সাজেক যেতে হয় চাঁদের গাড়ি বা হিলাক্সে।

যেখানে থাকবেন

সাজেক ভ্যালিতে বর্তমানে বিভিন্ন রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস রয়েছে। সাধারণ থেকে বিলাসবহুল; সব ধরনের থাকার ব্যবস্থা আছে। রুইলুই ও কংলাক পাড়ায় বেশ কয়েকটি ভালো রিসোর্ট রয়েছে যেগুলো থেকে পাহাড় ও মেঘের দৃশ্য উপভোগ করা যায় বারান্দায় বসেই। অনেক রিসোর্টেই ক্যাম্পফায়ার, বারবিকিউসহ অতিরিক্ত আয়োজন করা যায়। বুকিং করার আগে অবশ্যই রিসোর্টের অবস্থান, দৃশ্য ও বাজেট মিলিয়ে নেওয়া ভালো। শীত সময়ে বাড়তি ভিড় থাকে, তাই আগেভাগেই বুকিং নিশ্চিত করা জরুরি।

যা খাবেন

সাজেকের খাবারের আয়োজনও বেশ বৈচিত্র্যময়। হোটেল প্লাজা/হাজি

কিচেন-এ পাহাড়ি বাঙালি খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। স্থানীয় পাংখোয়া বা লুসাই রান্নার স্বাদের জন্য কিছু হোমস্টে ধাঁচের রান্নাঘরও রয়েছে। গরম গরম ভাত, পাহাড়ি মুরগি, সবজি, বাশের কোরোর ঝোল ভ্রমণে বিশেষ স্বাদ যোগ করবে। রাতে ক্যাম্পফায়ারের মাঝে বারবিকিউ উপভোগ করলে সাজেক ভ্রমণ সম্পূর্ণতা পায়।

সাজেক ভ্রমণে দরকারি

শীতে অতিরিক্ত গরম পোশাক সঙ্গে রাখুন; সাজেকে রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। পাহাড়ি পথ দুর্গম, তাই যাতায়াতে নির্ভরযোগ্য গাড়ি বেছে নিন।

পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বা আবর্জনা পাহাড়ে না ফেলে সঙ্গে করে ফিরিয়ে আনুন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।