কল্পনা করুন একটি শীতল সকাল, কুয়াশার চাদর ধীরে ধীরে সরতে শুরু করেছে এমন এক আবেশময় মুহূর্ত, যেখানে শীতল হাওয়া মুখে এসে ছুঁয়ে যায়, আর অস্থিরতাকে আলিঙ্গন করে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে স্বয়ং প্রকৃতি। এরপর যদি কল্পনা থেকে বেরিয়ে আঁতকে উঠে দেখেন কল্পনা নয়, সবই বাস্তব, তাহলে কেমন হয়? হ্যাঁ, এমনই একটি পর্যটনকেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই উদ্যানে প্রবেশ করলে মনে হবে যেন হঠাৎ করেই এক অন্য জগতে এসে পড়েছেন। এই বন শুধু একটি বনই নয়, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের এক মহারণ্য, যার প্রতিটি শিকড়, প্রতিটি পাতা, প্রতিটি শব্দ বলে প্রকৃতির এক অনন্ত গল্প। ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এই চিরহরিৎ বনটি বাংলাদেশের অবশিষ্ট অতিবৃষ্টি অরণ্যগুলোর অন্যতম। শীতের দিনে বনটির রূপ হয়ে ওড়ে আরও সজীব। সকালে সূর্যের তির্যক আলো যখন গাছপালার ওপর পড়ে, তখন বনের ঘন সবুজ মাথার ওপর সোনালি রঙের এক মায়াবী পর্দা তৈরি হয়। লাউয়াছড়ার বহু উঁচু গাছগুলো নিজেদের মধ্যে আলো পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে মাথার ওপর তৈরি করে।
ঘন চাঁদোয়া; যার ফাঁক দিয়ে সূর্যালোকের সরু রেশমি রেখা মাটিতে এসে পড়ে। অরণ্যের গভীরে দাঁড়িয়ে সেই আলো-ছায়ার খেলা দেখতে দেখতে মনে হয়, এ যেন রঙতুলিতে আঁকা কোনো জাদুকরী ছবি। লাউয়াছড়া বন তার প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বখ্যাত। জাতীয় তথ্যকোষের তথ্যমতে, এখানে রয়েছে ৪৬০ প্রজাতির বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণী। যার মধ্যে হরিণ, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বাগডাশ, সজারু, অজগর সাপ, গুইসাপ, মেছোবাঘ, চিতাবিড়াল উল্লেখযোগ্য। তবে বনটি বিশেষভাবে বিখ্যাত বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য। এই উদ্যানই তাদের সবচেয়ে বড় বিচরণভূমি। শীতের সকালে খুব ভোরে, গভীর বনের বিভিন্ন দিক থেকে ভেসে আসে উল্লুকের ডাক। এ ছাড়াও পাখির চঞ্চলতা এখানে আরও এক অলৌকিক মাত্রা যোগ করে। পাহাড়ি ময়না, ধনেশ, মথুরা, সবুজ ঘুঘুদের রঙিন পালক আর কিচিরমিচির শব্দ বনের সুরকে আরও মধুর করে তোলে। একদিকে পাখির ডাক, অন্যদিকে ঝিঝি পোকার একঘেয়ে গুঞ্জন মিলিয়ে প্রতিটি দিন লাউয়াছড়া হয়ে ওঠে এক পরিপূর্ণ জৈবিক সিম্ফনি। এ বন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নয়, ইতিহাস ও মানুষের সহাবস্থানেরও একটি মুগ্ধকর গল্প বহন করে।
ব্রিটিশ আমলে এখানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল নতুন বনগঠনের যাত্রা। সে সময় এই অঞ্চলটি পরিচিত ছিল পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন নামে। পরে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজ লাউয়াছড়া একটি আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষিত এলাকা; গবেষণা, পর্যটন এবং পরিবেশ শিক্ষার জন্য এটি এক আদর্শ স্থান। এই বনের ভেতরে চলাচলের জন্য রয়েছে তিনটি ট্রেইল। প্রতিটি ট্রেইলেই রয়েছে আলাদা অভিজ্ঞতা। শীতের সকালে ট্রেকিং শুরু করলে প্রথমেই চোখে পড়ে কুয়াশায় ভেজা পত্রপল্লব। পদে পদে শোনা যায় ভিজে মাটির গন্ধ, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অমূল্য অনুভূতি। দীর্ঘ ট্রেইলে হাঁটলে বনের গভীরে প্রবেশের অনুভূতিও তত বাড়তে থাকে। গাছের পাতা ঝরে পড়ার শব্দ, দূরে কোনো অজানা প্রাণীর দৌড়ঝাঁপের শব্দ মিলিয়ে যেন রোমাঞ্চ আর প্রশান্তির এক অনন্য মিশ্রণ। চাইলে স্থানীয় গাইড সঙ্গে নিতে পারেন; তারা আপনাকে বনের অজানা গল্প, বিভিন্ন উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য ও প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে চমৎকারভাবে জানিয়ে দেবেন। লাউয়াছড়া বনের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ খাসিয়াপুঞ্জি। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শান্ত-সরল জীবনযাপন, তাদের ঘরবাড়ির অনন্য স্থাপত্য লাউয়াছড়া বনকে আলাদা এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা দেয়। বনের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা ঝিরিপথে চা বাগানের সবুজ কার্পেটের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এই উদ্যানে শীতের দিনে যে অনুভূতি তৈরি হয়, তা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। বাতাসে থাকে অদ্ভুত এক সতেজতা, চারপাশে গভীর নীরবতা, আর মন-মস্তিষ্কে সৃষ্টি হয় এক শান্ত সুর। তাই প্রকৃতির সঙ্গে এমন নিবিড় আত্মীয়তা তৈরি করতে এই লাউয়াছড়া হতে পারে এই শীতের সেরা গন্তব্য।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার জন্য ট্রেন সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত অথবা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন নিয়ে শ্রীমঙ্গলে যেতে পারেন। ট্রেনে ভাড়া শ্রেণি অনুযায়ী ২৪০-৮২৮ টাকা এবং সময় নেয় ৭-৭.৫ ঘণ্টা।
বাসে শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার জন্য ফকিরাপুল বা সায়দাবাদ থেকে ৫৭০-৭০০ টাকার মধ্যে এসি/নন-এসি বাস পাবেন। বাসে যেতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম থেকেও ট্রেন বা বাসে শ্রীমঙ্গলে আসা যায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন