ঢাকা রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

‘কার্নিভাল অব চেঞ্জ’-এ তরুণদের উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ১২:১৪ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মের ভাবনা, উদ্ভাবন ও নানা উদ্যোগের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হলো ব্র্যাকের ‘কার্নিভাল অব চেঞ্জ ২০২৫’। তরুণদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের যাত্রাকে শক্তিশালী করতে আয়োজিত এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ২৫০ জনের বেশি তরুণ-তরুণী অংশ নেন। ২৯ ও ৩০ নভেম্বর সাভারের ব্র্যাক সিডিএম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের সামাজিক উদ্যোগ উপস্থাপনার পাশাপাশি ছিল আলোচনা, মতবিনিময় ও কর্মশালা।

চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত ১২টি প্রকল্পের মধ্য থেকে সৃজনশীলতা, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সম্ভাবনাময় তিনটি উদ্যোগকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্যোগগুলো হলো- প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অডিওবুক ‘স্টোরিজ অব ইনক্লুশন’, নারকেলের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব চারকোল উৎপাদনের প্রকল্প ‘জলশিখা’, এবং শিশুদের শিক্ষামূলক খেলনা তৈরির উদ্যোগ ‘গুড্ডু টয়েজ’। এই প্রথমবারের মতো চেঞ্জমেকার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীরা পাচ্ছেন ব্র্যাকের সোশ্যাল এন্টারপ্রেনার্স ফেলোশিপ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘জীবনে কোনো কিছু ছাড়তে হয় না। একবার রক্তের মধ্যে কিছু মিশে গেলে তার পিছু নিতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করো—তোমার জীবন কী চায়, স্বপ্ন কী চায়? স্বপ্নকে অনুসরণ করো। স্বপ্নকে অনুসরণ করলে শীর্ষে পৌঁছাতে পারবে। জীবনে নতুন কিছু করো।’ ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ ‘সায়েন্স অব ফাইন্ডিং আ ওয়ে’ বা ‘পথ খুঁজে পাওয়ার কৌশল’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হয় অনুপ্রেরণাদায়ক সেশন ‘ইউথ ভয়েসেস একোয়িং দ্য এসেন্স অব চেঞ্জমেকিং’ দিয়ে। এরপর ‘দ্য ওয়ে টু সাকসেস’ শীর্ষক বক্তৃতায় ব্র্যাকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ক্লাস্টারের পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, ‘সাফল্যের কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা নেই। প্রতিটি ব্যক্তি তার জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে সাফল্যকে সংজ্ঞায়িত করেন। সমাজ সাফল্যকে সংকীর্ণ ও বস্তুবাদী গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখে, অথচ সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই সংজ্ঞায় প্রতিফলিত হয় না।’

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ‘আমরা নতুন ইয়াং চেঞ্জমেকার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’-এর উদ্বোধন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইউথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম হাসান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে রয়েছে হাজারো সমস্যা। আমাদের তরুণেরাই এগুলোর সমাধান করবে। তরুণদের উদ্যোগ যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে, সে কারণেই ২০১৮ সালে “আমরা নতুন নেটওয়ার্ক (এএনএন)” যাত্রা শুরু করে।’

প্রাথমিক পর্যায়ের ৫০টি আবেদনের মধ্যে চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিত হয় ১২টি প্রকল্প। বিজয়ী তিনটির বাইরে অন্যান্য মনোনীত উদ্যোগের মধ্যে ছিল—কফি বর্জ্য থেকে অলঙ্কার তৈরির প্রকল্প ‘ইকো কেয়ার’; নারকেলের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প তৈরির ‘উত্তরণ’; পুরোনো কাপড় পুনর্ব্যবহার করে চুড়ি ও শাড়ি তৈরির প্রকল্প ‘আরোহণ’; পুরোনো কাপড় পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে পণ্য তৈরির ‘ত্রিরি’ ও ব্যাগ তৈরির ‘প্রেরণা’; শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের নারীদের জন্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাড তৈরির উদ্যোগ ‘নির্ভয়া’; আখের বর্জ্য থেকে শিল্পপণ্য তৈরির ‘শূন্য’; টেক্সটাইল বর্জ্য থেকে ফ্যাশন পণ্য তৈরির ‘নান্দনিক’; এবং খুলনার এক গ্রামে কমিউনিটি লাইব্রেরি পরিচালনার উদ্যোগ ‘হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি’।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এএনএন-এর তরুণ সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ ও সভ্যতা সংগীত পরিবেশন করেন।

কার্নিভাল অব চেঞ্জ ২০২৫-এর প্রথম দিনটি ছিল স্বীকৃতি, উদ্ভাবন, সংলাপ ও উদযাপনের এক প্ল্যাটফর্ম, যা দেশের পরবর্তী প্রজন্মের চেঞ্জমেকারদের ক্ষমতায়নে ব্র্যাকের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে।

দ্বিতীয় দিনের আয়োজনেও থাকছে তরুণ-তরুণীদের আত্মউন্নয়ন, ক্যারিয়ার নির্দেশনা, দেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা ও কর্মশালাসহ নানা কার্যক্রম।

ব্র্যাকের ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বগুণ বিকাশই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। দেশের ১৭টি জেলায় বিস্তৃত এএনএন কার্যক্রমের মাধ্যমে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি তরুণ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ তরুণ চেঞ্জমেকারদের মধ্যে অনেকে গেটস ফাউন্ডেশন, নাসা ও জাতিসংঘ থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এএনএন-এর অ্যালামনাইরাও এখনো যুক্ত রয়েছেন এই প্ল্যাটফর্মে।