ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

আ.লীগের দাপুটে অর্ধশত নেত্রী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৪, ১২:৫৬ এএম
ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

*নিজ বাড়িতে নেই, হদিস পাচ্ছেন না কর্মীরাও
*অনেকের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে
*ক্ষমতার ছোঁয়ায় বিপুল ধন-সম্পদের মালিক


সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দিশেহারা। অন্য নেতাদের মতো কেন্ত্রীয় ও যুব মহিলা লীগের দাপুটে নেত্রীদের কেউ কেউ এখন রাজনীতি ছাড়তে চান। আত্মগোপনে থাকা নেত্রীরা গ্রেপ্তার আতংকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এদের মধ্যে কেবল সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। অর্ধশতাধিক নেত্রী পর্দার আড়ালে চলে গেছেন। তাদের কোনো হদিস মিলছে না। তাদের মুঠোফোনও বন্ধ। জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে যেসব নেত্রীরা প্রভাব খাটাতেন তারাই সবার আগে আত্মগোপনে চলে গেছেন। বর্তমানে সবচেয়ে তৃণমূল নেত্রীদের বাড়িঘরে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জনরোষে দেশের সবচেয়ে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান নেত্রী সভাপতি ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহানা ভারতে পালিয়ে গেছেন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা-শেখ রেহানার মতো আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নারী নেত্রীরা অনেকে গোপনে দেশত্যাগ করেছেন। দেশে লুকিয়ে রয়েছেন কেউ কেউ।

শেখ হাসিনা-রেহানার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রীরা ক্ষমতার পরশ পাথরে ছোঁয়ায় ধন-সম্পদে ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। গত সাড়ে ১৫ বছরে দৃশ্যমান রোজগার না থাকলেও দলটির নারী নেত্রী এবং তাদের পরিবারের সম্পদ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার পতনে মহাক্ষমতাশালী এসব নারী নেত্রী দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। আবার কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন আগে-পরে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপি এবং দলীয় পদধারী নারী নেত্রীদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে দেশজুড়ে।

সাবেক মন্ত্রী দিপু মনি গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও যুব মহিলা লীগের বাকি অর্ধশতাধিক নেত্রী পর্দার আড়ালে চলে গেছেন। গ্রেপ্তার আতংকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। ইতিমধ্যে অনেক নেত্রীর নামে একাধিক মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশ ছাড়ার পর দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী-প্রভাবশালী অনুসারীরা দেশত্যাগ করতে পারেননি। অনেকেই আবার আটক হয়েছেন বিমানবন্দরে। তবে সেই আটক তালিকায় নেই নারী নেত্রীরা।

আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দুটি পদ ফাঁকা। বর্তমানে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন ৭৯ জন। এই কমিটির সভাপতি শেখ হাসিনা একজন নারী। দলের সভাপতিমণ্ডলীর ১৬ সদস্যের মধ্যে নারী আছে তিনজন। তারা হলেন-বেগম মতিয়া চৌধুরী, জেবুন্নেসা হক এবং সিমিন হোসেন রিমি। এরমধ্যে সিমিন হোসেন রিমি জাতীয় চার নেতার একজন তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা ও সোহেল তাজের বোন। শেখ হাসিনা-রেহানা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এই শীর্ষ নেত্রীকে আর দেখা মেলেনি।

গত ১৯ আগস্ট দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. দীপু মনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি সাবেক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও সবশেষ সমবায়মন্ত্রী ছিলেন। সরকার পতনের পর চাঁদপুরে দীপু মনির ডান হাত হিসেবে পরিচিত সেলিম খানকে পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। দীপু মনি চাঁদপুর জেলাসহ দেশব্যাপী বিতর্কিত ছিলেন নানা ঘটনায়।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর মধ্যে নারী আছেন ছয়জন। তারা হলেনÑ অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক জাহানারা বেগম এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা। সরকার পতনের পর এই নেত্রীদের কাউকেই প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি তাদের মোবাইল নম্বরও বন্ধ।

আওয়ামী লীগের ২৭টি সদস্য পদের মধ্যে নারী রয়েছেন ৯ জন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোতে এরমধ্যে অনেককেই নিয়মিত দেখা গেছে।

তারানা হালিম, অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণার মতো পরিচিত নেত্রীরা গা ঢাকা দিয়ে আছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি বছরজুড়েই আলোচনায় থাকেন দলটির সহযোগী সংগঠনের নেত্রীরা। বিভিন্ন সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেত্রীরা এখন আত্মগোপনে। আওয়ামী লীগের নারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ। সংগঠনটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি এবং সাধারণ সম্পাদক শবনম জাহান শিলা ৫ আগস্ট থেকে এই দুই নেত্রীরও কোনো খোঁজ মেলেনি।

মেহের আফরোজ চুমকির গাজীপুর ও ঢাকার দুই বাসাতেই হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মুঠোফোনে তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। শুরু থেকেই আত্মগোপনে আছেন শবনম জাহান শিলা। বর্তমানে সংগঠনের দুই শীর্ষ নেত্রী ছাড়াও সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোজিনা নাসরিন নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

যুব মহিলা লীগের সভাপতি আলেয়া সারোয়ার ডেইজি বর্তমানে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। গত ৩ আগস্ট সরকার পতনের দুই দিন আগে দেশ ছাড়েন তিনি। সাধারণ সম্পাদক শারমিন সুলতানা লিলি দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। আলোচিত-সমালোচিত যুব মহিলা লীগের ঢাকা উত্তরের সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিনের সরকার পতনের পর থেকে লাপাত্তা রয়েছেন।

সদ্য পদত্যাগী জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের সবাই ৫ আগস্টের পর থেকেই পর্দার আড়ালে চলে যান। তাদের অধিকাংশ আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় গ্রেপ্তার আতংকে। বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, মাহবুব আরা বেগম গিনি, মোছা. জান্নাত আরা হেনরী, মমতাজ বেগম, নিলুফার আনজুম, সাগুফতা ইয়াসমিন, কোহেলী কুদ্দুস ও সৈয়দা জাকিয়া নূরসহ যারা পতিত হাসিনা সরকারের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য তাদের সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং মহিলা লীগের শীর্ষ দুই নেত্রীসহ সবাই তাদের নিজ বাড়িতে থাকছেন না। তাদের প্রায় সবারই মুঠোফোন নম্বর বন্ধ।

কর্মীরাও তাদের হদিস পাচ্ছে না। হদিস না মেলাদের মধ্যে রয়েছনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সিমিন হোসেন রিমি, জেবুন্নেসা হক, অর্থ ও পরিকল্পনাবিয়ষক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক জাহানারা বেগম, শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক বেগম শামসুর নাহার এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য বেগম আখতার জাহান, মেরিনা জাহান, পারভীন জামান কল্পনা, সফুরা বেগম রুমি, অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, মারুফা আক্তার পপি ও গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা ও বিশিষ্ট নাট্যাভিনেত্রী তারানা হালিম। মহিলা আওয়ামী লীগ মেহের আফরোজ চুমকি এবং সাধারণ সম্পাদক শবনম জাহান। এ ছাড়াও আলোচিত অপু উকিল, যুবলীগের সানজিদা আক্তার তুহিনসহ অন্যদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

মূল দলের পাশাপাশি মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, নগর-মহানগর, জেলা-উপজেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নারীনেত্রীরা একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। সূত্রমতে, নিজেদের রক্ষা করতে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বেকায়দায় রয়েছেন কর্মীরাও।