জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়াসহ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুলিশের বিতর্কিত কর্মকা-ে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাহিনীতে সংস্কারের দাবি উঠেছিল। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন এবং পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এক পর্যায়ে ১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে পুলিশের পোশাকও পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু নতুন পোশাক নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন পোশাকে পুলিশ দায়িত্ব পালনের ৬ মাস পর আগের পোশাকে ফেরার দাবি ওঠে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর পুলিশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগের পোশাকে ফেরানো হয় পুলিশকে। গতকাল বুধবার আগের পোশাকের একটি অংশ ঠিক রেখে প্যান্টের কালার পরিবর্তন করে নতুন পোশাকে ফিরেছে পুলিশ। যদিও নতুন পোশাকের টেন্ডার দেওয়া হয় বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপকে। পুলিশের এ নতুন পোশাকে এখন থেকে মাঠে দেখা যাবে বাহিনীর সদস্যদের।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের দাবি ওঠে। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সরকার পুলিশকে নতুন পোশাকে ফেরাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৮ জুন পোশাকের রং পরিবর্তন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রজ্ঞাপনে পুলিশের শার্ট ও প্যান্টের পাশাপাশি জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার, জ্যাকেট, নারীদের পোশাক, মাথার আবরণ এবং পূর্ণহাতা পোশাকের রং-সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগে লোহা-ধূসর রঙের শার্টের ওপর লোহা-ধূসর রঙের ফুলহাতা জার্সি, কার্ডিগান বা পুলওভার ব্যবহারের কথা ছিল। নতুন বিধানে সেটির পরিবর্তে নীল রঙের শার্টের ওপর গাঢ় নীল রঙের ফুলহাতা জার্সি, কার্ডিগান বা পুলওভার যুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জেলা পুলিশ এবং এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি ও র্যাব ছাড়া অন্যান্য ইউনিটের ক্ষেত্রে ট্রাউজার হবে খাকি রঙের টিসি টুইল কাপড়ের। শার্ট হবে গাঢ় নীল রঙের টিসি প্লেইন ফেব্রিক কাপড়ের। শার্টের সামনে চারটি পকেট থাকবে। সামনের অংশে সমদূরত্বে সাতটি বোতাম থাকবে। প্রজ্ঞাপনে নারী পুলিশের পোশাকের বিষয়েও বিস্তারিত বলা হয়। নারী পুলিশ চাইলে শাড়ি পরতে পারবেন। জেলা পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটের ক্ষেত্রে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে গাঢ় নীল ব্লাউজ পরা যাবে। মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে হালকা জলপাই রঙের ব্লাউজের কথা বলা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নারী পুলিশ সদস্যরা চাইলে মাথার আবরণ ব্যবহার করতে পারবেন। ট্রাফিক ইউনিটে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যরাও সারা বছর পূর্ণহাতা শার্ট বা ব্লাউজ পরতে পারবেন। গর্ভাবস্থায় সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানের পূর্বানুমোদন নিয়ে নারী পুলিশ সদস্য সাধারণ পোশাক পরতে পারবেন। প্রজ্ঞাপনে মৌসুম অনুযায়ী শার্টের ধরনও নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে শার্ট হবে অর্ধহাতা। শীতকালে শার্ট হবে পূর্ণহাতা। মাথার আবরণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সেটি অনুমোদিত গাঢ় নীল রঙের হবে।
সূত্র জানিয়েছে, গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই রঙের শার্ট এবং খাকি রঙের প্যান্টের নতুন পোশাক পরে নতুন পোশাকে পুলিশের দায়িত্ব পালনের কার্যক্রম শুরু করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক। গতকাল এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন পোশাকে ফেরেন পুলিশ কর্মকর্তারা। প্রজ্ঞাপন জারি করার পর এ পোশাক চালু করল পুলিশ। এর দুই মাস আগে নতুন পোশাকে পুলিশকে ফেরাতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু নির্দেশনা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের বেটিং শেষে নতুন পোশাকে ফিরে পুলিশ।
পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই পুলিশকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে পোশাক পরিবর্তন করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছর ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুলিশের শার্টের রং আয়রন বা লোহা-ধূসর, আর প্যান্টের রং ছিল কফি শেল বা কফি-বাদামি ধূসর। গত বছরের ২৫ নভেম্বর নতুন পোশাকে মাঠে নামে পুলিশ। নতুন পোশাকের জন্য ১৪১ কোটি টাকা খরচ করা হয়। নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের কাজ পেয়েছিল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নোমান গ্রুপ। তখন ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নি¤œমানের কাপড় সরবরাহেরও অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি নতুন পোশাকের যে কালার চূড়ান্ত করা হয়েছিল সেই রং মাঠ পুলিশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। আয়রন কালারের পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনে খুশি ছিল না। তবুও সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আয়রন রঙের শার্ট এবং কফি রঙের প্যান্টের সমন্বয়ে নতুন পোশাক পরে দায়িত্ব পালনে পুলিশের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ আগের পোশাকে ফিরতে দাবি তোলে। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের নতুন পোশাকের নানা নেতিবাচক দিক তুলে ধরে আগের পোশাকে ফেরার কিছু যৌক্তিকতা তুলে চিঠি দেওয়া হয়।
পুলিশের ওই দাবি আমলে নিয়ে কিছু পরিবর্তন করে আগের পোশাকে পুলিশকে ফেরাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কয়েক দফায় বৈঠক শেষে জেলা পুলিশের জন্য গাঢ় নীল রঙের পোশাক এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য জলপাই কালারের শার্ট ঠিক রেখে শুধু খাকি রঙের প্যান্টযুক্ত করে নতুন পোশাকের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই-বাছাই করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে বেটিং শেষ করে নতুন পোশাকের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। জুন মাসে নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের জন্য আগের পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপকে কাজ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে নোমান গ্রুপ কাপড় সরবরাহ করার পর নতুন পোশাকের কাপড় মাঠ পর্যায়ে কিছু বিতরণ করা হয়।
গতকাল বুধবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পরিচালিত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নবনির্মিত ‘বরকাউ পুলিশ ক্যাম্প’ উদ্বোধন করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। অনুষ্ঠানে গাঢ় নীল শার্টে ও খাকি প্যান্টে এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে হালকা জলপাই রঙের শার্ট ও খাকি প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাৎ হোসেনে জানান, নতুন পোশাক গতকাল থেকে পরতে শুরু করেছে পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন ইউনিটে প্যান্ট শুধু খাকি রঙের দেওয়া হয়েছে। শার্ট আগের রঙ অর্থাৎ গাঢ় নীলই রাখা হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য জলপাই রঙের শার্টের সাথে খাকি রঙের প্যান্ট দেওয়া হয়েছে। এখনো সব জেলায় নতুন পোশাক চালু হয়নি। ধীরে ধীরে আগের পোশাক চালু হবে। তবে এপিবিএনের পোশাক আগেরটাই আছে। সেখানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ জানান, আজ (গতকাল) থেকে নতুন পোশাক পরছে পুলিশ সদস্যরা। এখনো সব পুলিশ সদস্যের হাতে পৌঁছেনি নতুন পোশাক। পর্যায়ক্রমে সব সদস্যই পাবেন। যারা পেয়েছেন তারা নতুন ইউনিফর্মেই দায়িত্ব পালন করছেন।

