তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি। নদীতীরবর্তী এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। গত দুই দিনে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে নদীভাঙনের শিকার হয়েছে ৬৫টি পরিবার বলে জানিয়েছেন রংপুর অঞ্চলের পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আবারও পানি বাড়ার শঙ্কা থাকায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তিস্তাতীরবর্তী চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। চরাঞ্চলবাসীদের সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বুধবার দুপুর ১২টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৮৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ১২ ঘণ্টায় এই পয়েন্টে পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমেছে। এখানে বিপৎসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। একই সময়ে কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এদিকে, হঠাৎ তিস্তা নদীর পানি বাড়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডান তীর সংরক্ষণে নির্মিত গ্রোয়েন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কোলকোন্দ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে পাট, চিনাবাদাম ও আমনের বীজতলা। পাশাপাশি লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ধরলা, দুধকুমারের তীব্র ভাঙনে দিশারায় হয়ে পড়েছে নদীপারের মানুষ। বিপৎসীমার ওপরে বইছে দুধকুমারও।
চলতি মৌসুমে গত ২৩ জুন প্রথমবারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে পরদিনই তা বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। এরপর ২৯ জুন সন্ধ্যায় আবারও পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৭ ও ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি কখনো বাড়ছে, আবার কমছে। এ পরিস্থিতিতে পাঁচ জেলার নি¤œাঞ্চলে নদীর কোলঘেঁষা অন্তত ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুরক্ষা বাঁধে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙছে তিস্তার লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অংশেও। ৫ জেলার বিভিন্ন এলাকার শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি এখন হাঁটুপানির নিচে। আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাসহ গবাদি পশুর খাদ্যের সংকট, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানিসহ খাদ্য সংকটে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ।
গত বছর ভাঙনের পর স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ না করে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং (স্পার) নির্মাণ করা হয়, যা কার্যকর না হওয়ায় সরকারের ১৪ লাখ টাকা গচ্ছায় গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, বাঁশের পাইলিং বসানোর ছয় মাসও হয়নি। চলতি বর্ষা মৌসুমের প্রথম ধাপেই পানির চাপ ও তীব্র স্রোতের মুখে বাঁশের পাইলিং ধসে গেছে।
চর শংকরদহ গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, রাতারাতি পানি বাড়ল, ঘরবাড়ি ডুবে গেল। এখন পানি কিছুটা নামছে, কিন্তু নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে পানি উঠেছে। শিশু আর গবাদি পশু নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি।’
একই অবস্থা কাউনিয়া উপজেলা তিস্তা নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে। সেখানকার পাঞ্চরভাঙ্গা গ্রামের আরমান বলেন, কয়েক দিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছিল। পানি বেশি হলে তো সমস্যা। স্ত্রী-সন্তান ও গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়েও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। কুড়িগ্রামের উলিপুর, নাগেশ্বরীতে তিস্তার তীব্র স্রোতে ভেঙে গেছে ২০০ মিটার বেরিবাঁধ।
গঙ্গাচড়া উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা মহিপুরে নির্মিত দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু। কিন্তু বিগত সময়ের মতো এবারও বর্ষা মৌসুমে এই সেতুর সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশে ধস দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর প্রান্তে সংযোগ সড়কের অন্তত ১৫টি স্থানে ধস ও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচ উঠে গিয়ে সড়ক দেবে গেছে। এতে ভারি যানবাহনের পাশাপাশি ছোট যান ও মোটরসাইকেলচালকদের জন্যও চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সেতুসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর মিয়া বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টির পর হঠাৎ করেই রাস্তার কয়েক জায়গা দেবে যেতে শুরু করে। এখন বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন এত মানুষ চলাচল করে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
পথচারী মাহমুদ মিয়া বলেন, সড়কটির অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। কয়েক জায়গায় ধসে গেছে। আরও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ধসের বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্টদের পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মেরামত কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
গংগাছড়া উপজেলার বড়াইবাড়ী খেয়াঘাট থেকে নদীর ওপারে তাকালেই দেখা যায় মাটির দীর্ঘ বাঁধ। তবে সরকারি কোনো প্রকল্প নয়, ঠিকাদারের নির্মাণও নয়; দিনমজুর, কৃষক, জেলে আর চরবাসীর শ্রমে গড়ে ওঠা এ বাঁধ তিন বছর ধরে পাঁচটি গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। কিন্তু উজানের ঢল আর তিস্তার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে এখন দেখা দিয়েছে ভাঙন। ফলে ১২ হাজার পরিবারের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে উৎকণ্ঠা।
স্থানীয়রা বলছেন, তিন বছর আগে বন্যায় বাগডোহরা চরের নিচাপাড়ার তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায় তিস্তায়। সে সময় বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে গেলেও নেয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন বাঁধ নির্মাণের। চাঁদা তোলা হয় গ্রামের মানুষের কাছ থেকে। কেউ টাকা দিয়েছেন, কেউ শ্রম। দিনের কাজ শেষে রাতভর মাটি কেটেছেন অনেকে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে পানিবন্দি মানুষের পাশে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় তিস্তা সেতুরক্ষা বাঁধে যখন প্রথম ভাঙন শুরু হয়েছিল, তখন সময়মতো অল্প কিছু জিও ব্যাগ ফেললেও পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। গত বছর থেকেই বরাদ্দের কথা শুনে আসছি, কিন্তু কোনো বরাদ্দ আসেনি। পরে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বাঁশের পাইলিং করা হলেও পানি বাড়ার শুরুতেই প্রথম চাপেই সেটি ভেঙে গেছে। এতে প্রায় ১৪ লাখ টাকার কাজ ধ্বংস হয়ে গেছে।
কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী জানান, উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে তার ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই কথা জানান টেপামধুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দিনের বেলায় পানি বাড়লে তীরবর্তী এলাকায় সমস্যা কম হয়। কিন্তু রাতের বেলায় পানি বাড়লে নদীপাড়ের মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। এ ছাড়া সৃষ্ট বন্যায় নদীতীরবর্তী আবাদি জমিগুলো তলিয়ে বাদামসহ বিভিন্ন শাক-সবজিখেতের ক্ষতি হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩২০ হেক্টর আমন ধান, ৮ হেক্টর মাসকলাই, ৮৬০ হেক্টর বীজবাদাম ও ৭৯০ হেক্টর সবজির জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, তিস্তা নদীর পানি আগামী তিন দিন বৃদ্ধিসহ বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। বন্যাসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

