ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬

সিলেটের বালাগঞ্জ

পানি ও স্যানিটেশনে চরম ভোগান্তি

আবুল কাশেম অফিক, বালাগঞ্জ
প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৬:৪৭ এএম

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এবং আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যুগেও সিলেটের বালাগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিশ্চিত হয়নি ন্যূনতম মৌলিক সুযোগ-সুবিধা। নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং জরাজীর্ণ ও পুরোনো ধাঁচের স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে টিনের তৈরি ভাঙা টয়লেট ও আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধার অভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও উপজেলার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, এক-তৃতীয়াংশ স্কুলের নলকূপ গত ২-৩ বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপ দিয়ে বালু ও আয়রনযুক্ত পানি বের হচ্ছে, যা পানের অনুপযোগী। ওয়াশ ব্লক স্থাপনের প্রকল্প থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সেগুলো শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। পানি ফুরিয়ে গেলে তারা পার্শ্ববর্তী বাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা দোকান থেকে পানি সংগ্রহ করছে, এতে ক্লাসের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।

বালাগঞ্জ আদর্শ, বির্ত্তুনিয়া, চরসুবিয়া জাগরণী, চকদৌতপুর, মেঘারকান্দি, তেঘরীয়া, গৌরীপুর, কুবেরাইল ও ফাজিলপুর মুজেফরসহ অন্তত ১০টি বিদ্যালয়ের চিত্র একই। এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা টয়লেট ব্যবহারের জন্য পার্শ্ববর্তী পুকুর বা খালের পানির ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য ‘টিনের টয়লেট’ ব্যবহারের বিষয়টি সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। গৌরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, ভাঙা টিনের টয়লেট ও নষ্ট দরজার কারণে ছাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) হেপি দাস সতর্ক করে বলেন, ‘ট্যাংকির পানিতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘক্ষণ প্রকৃতির ডাক চেপে রাখতে বাধ্য হয়, যা বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ এছাড়া দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিদ্যালয়গুলোর এই বেহাল দশার জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রকিব ভূঁইয়ার উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সচেতন মহল। অভিযোগ রয়েছে, টানা ৮ বছর ধরে ওই কর্মকর্তা দায়িত্বে থেকে বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি বিদ্যালয়গুলোতে আসা ‘স্লিপ ফান্ড’-এর অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় মাসিক সমন্বয় সভায় খোদ জনপ্রতিনিধিরাই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষা সচেতন মহলের মতে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় শিক্ষা কর্মকর্তা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না।

বালাগঞ্জ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাল মোহন দাস নান্টু জানান, প্রশাসনিক ভবনের কাজের জন্য দীর্ঘদিন পানির লাইন বন্ধ থাকায় তারা চরম সংকটে আছেন। বেশিরভাগ প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, স্লিপ ফান্ডের সামান্য টাকায় বড় ধরনের সংস্কার কাজ সম্ভব নয়, আর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও কোনো ফল মিলছে না। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে প্রধান শিক্ষকদের নাম ভাঙানো হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী কামরুল হাসান প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রকিব ভূঁইয়ার দাবি, কিছু স্কুলে জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টিনের টয়লেট সরাতে দেরি হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৭-২৮ অর্থবছরের ভেতরে উপজেলার সব স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হবে।

তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে সব বিদ্যালয়ে আধুনিক ওয়াশ ব্লক ও পানির ব্যবস্থা করার প্রকল্প চলমান রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে যেসব বিদ্যালয়ে সংকট রয়েছে, পিইডিপি-৫ এর মাধ্যমে সেগুলোর তালিকা তৈরি করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’