বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্য শুধু একটি জনস্বাস্থ্য ইস্যু নয়, এটি একই সঙ্গে রাজস্ব, অর্থনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে সরকার একদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি করে আসছে, অন্যদিকে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্বও অর্জন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা উদ্বেগজনক। বৈধ তামাকপণ্যের বাজার যেখানে সীমিত পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে অবৈধ সিগারেটের বাজার আশঙ্কাজনক গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈধ শিল্প এবং বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।
বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য বলছে, দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩-১৫ শতাংশ এখন অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে। প্রতি মাসে কোটি কোটি শলাকা অবৈধ সিগারেট বাজারে প্রবেশ করছে, যা বার্ষিক হিসাবে বিপুল আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতির কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের জন্য যে রাজস্ব প্রয়োজন, তার একটি বড় অংশ এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অবৈধ সিগারেট ব্যবসা এখন একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার, কর ফাঁকি, চোরাচালান এবং জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের প্যাকেট নকল করে নি¤œমানের পণ্য বাজারজাত করার মতো কর্মকা-ের মাধ্যমে এই চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সীমান্ত ও বন্দরভিত্তিক চোরাচালান থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে অবৈধ উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছে। ফলে এটি আর শুধু একটি কর ফাঁকির ঘটনা নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধের রূপ নিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বেশ কিছু আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযোজন, ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস সিস্টেম চালু, ডিজিটাল ব্যান্ডরোল মনিটরিং, এআইভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং মাল্টি-এজেন্সি টাস্কফোর্স গঠনের মতো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং ইকিবাচক পদক্ষেপ।
তবে শুধু প্রযুক্তি প্রবর্তন করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নও হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নিরবচ্ছিন্ন। অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে দুর্বল তদারকি, সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাই এনবিআর, কাস্টমস, ভ্যাট গোয়েন্দা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর কাঠামোর যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস। করের হার এমন পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অক্ষুণœ থাকে, কিন্তু বৈধ ও অবৈধ পণ্যের দামের ব্যবধান এত বেশি না হয় যে তা চোরাচালান ও কর ফাঁকিকে উৎসাহিত করে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ করনীতি অবৈধ বাজারের আকর্ষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, অবৈধ সিগারেট শুধু সরকারের রাজস্ব কমায় না, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। মাননিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে উৎপাদিত এসব পণ্যে কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে ভোক্তারা আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। তাই অবৈধ তামাকবিরোধী অভিযানকে কেবল রাজস্ব সংগ্রহের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
অবৈধ তামাক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, সমন্বিত অভিযান এবং বাস্তবসম্মত কর সংস্কারের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভাঙতেই হবে। দেশের অর্থনীতি, বৈধ শিল্প এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এ লড়াইয়ে কোনো শৈথিল্যের সুযোগ নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন