× UCB Sticker Card
রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. তাহমিদ রহমান, শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০২:১০ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের মহামিলনকে কলঙ্কিত করল বর্ণবাদের বিষবাষ্প

মো. তাহমিদ রহমান, শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০২:১০ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের মহামিলনকে কলঙ্কিত করল বর্ণবাদের বিষবাষ্প

ফুটবল বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসর। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেষ্ঠ ফুটবল দল নির্ধারণের জন্য নয়, বরং জাতি, সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের এক অনন্য উপলক্ষ। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, প্রত্যাশা এবং স্বপ্নকে এক সুতোয় গেঁথে বিশ্বকাপ পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীকে। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্দেশ্য শুধু বিজয়ী নির্বাচন নয়, এর পরিধি আরও বিস্তৃত এবং গভীর। বিশ্বকাপ ফুটবল মানুষের মিলনের উৎসব। এটি বিভাজনের নয়, ঐক্যের প্রতীক। তাই এই মহামিলনের মঞ্চে বর্ণবাদের বিষবাষ্প কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সোমালিয়ান রেফারি ওমর আব্দুল কাদির আরতানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বিশ্বকাপ ফুটবলে সরাসরি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের সেরা ফুটবল দলকে নির্ধারণ করা। বিভিন্ন মহাদেশের দেশগুলো দীর্ঘ বাছাইপর্ব অতিক্রম করে এই মঞ্চে অংশগ্রহণ করে। ফলে প্রতিযোগিতার মান যেমন উচ্চ হয়, তেমনি ফুটবলের উৎকর্ষও বৃদ্ধি পায়। খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পায় এবং নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয় খেলাধুলায় অংশ নিতে। সেইসঙ্গে বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের সময় মানুষ একটি সাধারণ আবেগে একত্রিত হয়। বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা একই স্টেডিয়ামে বসে খেলা উপভোগ করে, একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকাপ বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক বন্ধুত্বের বার্তা বহন করে। এর পাশাপাশি বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লাখ লাখ পর্যটক খেলা দেখতে বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ করেন। এর ফলে হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবা খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আয়োজক দেশ তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পায়। বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকা-ে উৎসাহিত করা। খেলাধুলা শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা, নেতৃত্বগুণ এবং পরিশ্রমের মূল্য শেখায়।

বিশ্বকাপের তারকা খেলোয়াড়দের সাফল্যের গল্প তরুণদের স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে ক্রীড়াচর্চার প্রসার ঘটে এবং সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক হয়। তবে বিশ্বকাপের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হয়, যখন এটি বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখে। খেলাকে কেন্দ্র করে বর্ণবাদ, সহিংসতা বা রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে যদি সহমর্মিতা ও সম্মানবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবেই বিশ্বকাপ তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে সক্ষম হবে। ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের সর্বজনীন ভাষা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে এই খেলা কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপের মঞ্চেই যদি বর্ণবাদের কালো ছায়া নেমে আসে, তা হলে তা শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়; বরং মানবতার বিরুদ্ধে এক গভীর আঘাত। সোমালিয়ার প্রথম রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে দায়িত্ব পালনের খুব কাছে ছিলেন ৩৪ বছর বয়সি ওমর আব্দুল কাদির আরতান। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের ম্যাচ অফিসিয়ালদের চূড়ান্ত তালিকা থেকেও আরতানের নাম ছেঁটে ফেলা হয়। হতাশা নিয়ে বুধবার দেশে ফিরে যান ২০২৫ সালের কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের (সিএএফ) বর্ষসেরা রেফারি। রেফারি ওমর আব্দুল কাদির আরতানকে বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাটি এমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ওমর আব্দুল কাদির আরতান আফ্রিকান ফুটবলের এক উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে দক্ষতার সঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে দায়িত্ব পাওয়া একজন রেফারির জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি তা তার দেশের জন্যও এক বড় অর্জন। বিশেষ করে সোমালিয়ার মতো সংঘাত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশের একজন নাগরিকের জন্য এই সাফল্য ছিল অনুপ্রেরণার প্রতীক। কিন্তু সেই অর্জনের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় যখন জানা যায়, বিশ্বকাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। ঘৃণাভিত্তিক রাজনৈতিক এজেন্ডার কারণে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার যে সুযোগ আরতানের প্রাপ্য ছিল, তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতার বিষয় নয়, বরং এর পেছনে যে বৈষম্যমূলক মনোভাব কাজ করেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আধুনিক বিশ্বে বর্ণবাদকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হলেও বাস্তবতায় এটি এখনো নানা রূপে বিদ্যমান। কখনো কর্মক্ষেত্রে, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো-বা ক্রীড়াঙ্গনে।

চলমান বিশ্বকাপে এ ধরনের বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক ও জাতিবিদ্বেষ আচরণের শিকার হয়েছেন ক্যামেরুনে জন্ম নেওয়া সুইস স্ট্রাইকার ও সহ-অধিনায়ক ব্রিল এম্বোলো , মরক্কোর ডিফেন্ডার জাকারিয়া এল ওয়াহদি যিনি বেলজিয়ামের জুপিলার লিগের সেরা আফ্রিকান খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফুটবলের ইতিহাসও বর্ণবাদের কলঙ্ক থেকে মুক্ত নয়। মাঠে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বানরের ডাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অসংখ্য উদাহরণ আমরা দেখেছি। যখন একজন বিশ্বকাপ রেফারিকে তার পরিচয় ও জাতিগত পটভূমির কারণে বাধার মুখে পড়তে হয়, তখন পরিস্থিতিকে আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। বিশ্বকাপের অন্যতম মূল দর্শন হলো অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা বহু বছর ধরে ‘বর্ণবাদকে না বলুন’ স্লোগান সামনে রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও দর্শকদের মধ্যে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে যখন একজন রেফারি বর্ণগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তখন সেই প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রতীকী তাৎপর্য। বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বসমাজের একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা কোটি মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়। যদি বিশ্বকাপের মতো আয়োজনে সমতা নিশ্চিত করা না যায়, তা হলে সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা পৌঁছাবে? তরুণ প্রজন্ম কি বিশ্বাস করবে যে যোগ্যতা ও পরিশ্রমই সাফল্যের একমাত্র মানদ-? নাকি তারা মনে করবে, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়? বিশ্বায়নের এই যুগে ক্রীড়াঙ্গনকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। শুধু স্লোগান বা প্রচার নয়, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি। কোনো ব্যক্তি খেলোয়াড়, কোচ বা রেফারি যেই হোন না কেন, তার পরিচয় নয়; তার যোগ্যতাই হওয়া উচিত মূল্যায়নের একমাত্র মানদ-। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর উচিত এমন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো কর্মকর্তা বা ক্রীড়াবিদ একই ধরনের বৈষম্যের শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!