সকালের আলো ফোটার কথা ছিল বইয়ের পাতায় চোখ রেখে নতুন কিছু শেখার আনন্দে। দুপুর কাটার কথা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ আর খেলায়। সন্ধ্যায় মায়ের ডাকে ঘরে ফিরে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু পৃথিবীর অসংখ্য শিশুর জীবনে সেই পরিচিত শৈশব নেই। তাদের হাতে বইয়ের বদলে তুলে দেওয়া হয়েছে হাতুড়ি, ছুরি, ঝুড়ি, বস্তা কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি। কচি কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জীবিকার বোঝা। বিশ^জুড়ে এখনো প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। গত দুই দশকে শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও সংকট কাটেনি। বরং দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি, সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন করে অসংখ্য শিশুকে শ্রমবাজারে ঠেলে দিচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই রকম দৃশ্য দেখা যায়। কোথাও শিশুরা কৃষিক্ষেতে দীর্ঘ সময় কাজ করছে। কোথাও গোপন কারখানার অন্ধকার ঘরে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে দিন কাটাচ্ছে। কেউ বাজারে পণ্য বিক্রি করছে, কেউ আবর্জনার স্তূপে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস খুঁজছে। আবার কেউ গৃহকর্মের আড়ালে নির্যাতন ও শোষণের শিকার হচ্ছে।
শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে দারিদ্র্য। পরিবারের আয় যখন প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন সন্তানদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে অনেক পরিবার। বাবা-মায়ের সামনে তখন কঠিন প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñ ক্ষুধার সঙ্গে লড়বে, নাকি সন্তানকে কাজে পাঠাবে? জীবনের নির্মম বাস্তবতায় অনেকেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে বাধ্য হয়।
শুধু দারিদ্র্য নয়, শিক্ষার সীমিত সুযোগও শিশুদের শ্রমে ঠেলে দেয়। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পড়াশোনার ব্যয় বহনের অক্ষমতা কিংবা শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহের সুযোগ নিয়ে নিয়োগদাতারা কম মজুরিতে শিশুদের কাজে নিয়োগ দেয়। কারণ শিশুদের দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করানো যায়, প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও তুলনামূলক কম।
বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি খাত এখনো শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। মোট শিশুশ্রমের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ ঘটে এই খাতে। খেতের কাজ, পশুপালন কিংবা ফসল সংগ্রহের মতো শ্রমঘন কাজে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়োজিত থাকে। এর পরেই রয়েছে সেবা খাত, যেখানে গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে বাজারে পণ্য বিক্রি পর্যন্ত নানা কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হয়। শিল্প খাতেও শিশুদের উপস্থিতি উদ্বেগজনক। খনি, উৎপাদন শিল্প কিংবা বিপজ্জনক কারখানায় কাজ করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের ভয়াবহতা আরও গভীর। বিষাক্ত ধোঁয়া, তীব্র তাপ, ধারালো যন্ত্রপাতি, বিস্ফোরক পদার্থ কিংবা বিপজ্জনক রাসায়নিকের সংস্পর্শ শিশুদের শারীরিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অপুষ্টি, চর্মরোগ, শ^াসকষ্ট, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা এবং সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বহুগুণ। অনেক ক্ষেত্রে তারা মানসিক আঘাত, উদ্বেগ ও বিষণœতায়ও ভোগে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক তুলনা শিশুদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যখন একটি শিশু দেখে তার সমবয়সিরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, খেলছে কিংবা পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে, অথচ সে নিজে শ্রমে ব্যস্ত, তখন তার মধ্যে তীব্র হতাশা ও মানসিক যন্ত্রণা জন্ম নিতে পারে। এই ক্ষত অনেক সময় সারাজীবন বহন করতে হয়।
শিশুশ্রমের সঙ্গে সহিংসতা ও শোষণের সম্পর্কও গভীর। গৃহকর্ম, রাস্তার কাজ কিংবা জনচক্ষুর আড়ালে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিশুরা শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন এমনকি যৌন সহিংসতার শিকার হয়। অনেকেই ভয়, লজ্জা কিংবা অসহায়ত্বের কারণে অভিযোগও জানাতে পারে না। আরও ভয়াবহ হলো, কিছু শিশু সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের খপ্পরে পড়ে। অভিভাবকহীন কিংবা গৃহহীন শিশুরা সহজেই অপরাধচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাদের দিয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহন, চুরি, মাদক বহন কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকা- করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। জীবনের নিরাপদ ভিত্তি না পেয়ে তারা কখনো কখনো অপরাধের অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিশুশ্রম নির্মূলে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বহু দেশ আইন প্রণয়ন করেছে, আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবু কাক্সিক্ষত অগ্রগতি আসেনি। কারণ আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। নজরদারির অভাব, অপরাধ প্রমাণের জটিলতা এবং সামাজিক উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দরকার পরিবারভিত্তিক সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পরিবার যেন সন্তানের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল না হয়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর প্রাপ্য নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা, ভালোবাসা আর স্বপ্ন দেখার অধিকার। কোনো শিশুর স্থান বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে নয়; তার স্থান বিদ্যালয়ে, পরিবারের সান্নিধ্যে এবং মুক্ত আকাশের নিচে আনন্দময় শৈশবে।
শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। এটি মানবিক দায়িত্ব, সামাজিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক প্রতিশ্রুতি। পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলনই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন