বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন, সীমান্ত হত্যা এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই শুরু হয়েছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন। সম্মেলনের প্রথম দিনে নয়াদিল্লির কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, সীমান্তে পুশইন, নিরীহ নাগরিক হত্যা এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো কর্মকা- কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গতকাল সোমবার ভারতের নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে শুরু হওয়া ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অপরদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়।
বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পুশইন প্রতিরোধ। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনার প্রমাণ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিএসএফের কর্মকা-ে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। সীমান্ত-সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার সমাধান হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কোনো অবস্থাতেই একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ নেই।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ বহু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। বিজিবির দাবি, গত কয়েকদিনে অন্তত ৩০টি পৃথক ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের অভিযোগ, পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু বাংলাদেশি নন, ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গারাও রয়েছেন। যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই তাদের সীমান্তে এনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পুশইন ইস্যু এখন আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তে জিরো লাইনে আটকে থাকা মানুষের মানবিক সংকট দুই দেশের পারস্পরিক আস্থারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
বৈঠকের প্রথম দিনে সীমান্ত হত্যার বিষয়টিও জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সীমান্ত সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশের আকাশসীমায় ভারতীয় ড্রোন ও হেলিকপ্টারের অনুপ্রবেশ। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত নজরদারির নামে একাধিকবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের কর্মকা- বন্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে বৈঠকে।
এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধ, মানবপাচার বন্ধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ, মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন, তিনবিঘা করিডোর দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়েও আলোচনা হবে চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগরতলা থেকে আখাউড়ামুখী খালগুলো দিয়ে শিল্পবর্জ্য প্রবেশের বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হবে। এতে সীমান্তবর্তী কৃষিজমি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হবে। এ সমস্যা সমাধানে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় আনা হবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, এবারের সম্মেলন কেবল একটি নিয়মিত সীমান্ত বৈঠক নয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এটি দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আস্থা পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা। কারণ সীমান্তে প্রতিটি ঘটনা শুধু স্থানীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অন্তত দুই হাজার ৪৬৩ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গার উপস্থিতিও পাওয়া যায়। বিজিবির নিজস্ব পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই হাজার ৩৪৪ জনকে পুশইন করা হয়। তাদের মধ্যে ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৩৯ জন রোহিঙ্গা ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চারদিনের এই সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া গেলে দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন নজর সম্মেলনের পরবর্তী বৈঠকগুলোর দিকে, যেখানে এসব ইস্যুতে ভারত কতটা ইতিবাচক অবস্থান নেয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

