ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

ফ্ল্যাটে ‘কয়েকদিন’ পড়ে ছিল বৃদ্ধার মরদেহ, পাওয়া গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য 

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের একটি চারতলা ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের ধারণা, তিনি কয়েকদিন ধরে মারা পড়েছিলেন।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোকা দেখা যায়।

তিনি বলেন, ‘ঘরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা। শুধু বৃদ্ধার কক্ষ নয়, পুরো বাসাটিই দীর্ঘদিন ধরে অপরিচ্ছন্ন ছিল। মা–মেয়ে একই বাসায় থাকলেও বৃদ্ধা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব এবং আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। তাদের একজন বিদেশে অবস্থান করেন। তবে কেউই দীর্ঘদিন মায়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে থাকতেন না।

বৃদ্ধা মেয়ে ফাতিমা নাসরিনের সঙ্গে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এসআই শামসুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত তদারকির অভাব ছিল। মায়ের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর ঠিকভাবে নেওয়া হতো না।

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ের আচরণ ও কথাবার্তায় কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। তাকে পুরোপুরি স্বাভাবিক মনে হয়নি।’

এসআই শামসুর রহমান জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে ছেলেরা মাঝে মাঝে বাসায় আসতেন। এমনকি ২–৩ বছর আগেও সবাই একসঙ্গে থাকতেন। পরিবারের এক নাতিও সম্প্রতি কোরবানির ঈদের সময় সেখানে এসেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘তদন্তে জানা গেছে, বৃদ্ধার নিয়মিত দেখাশোনা ঠিকভাবে করা হতো না। মেয়েই মূলত তার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র বা প্রেসক্রিপশন পাওয়া যায়নি।’

পুলিশ আরও জানায়, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এমনকি এক পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বৃদ্ধার মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে এটি কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অসুস্থ অবস্থায় বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে তিনি আঘাত পেয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল সীমিত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান পলাশ বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এই পরিবারকে দেখছি, কিন্তু তারা খুব একটা মিশতেন না। ভেতরে কী ঘটত, তা কেউ জানত না।”

অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে ফাতিমা নাসরিনকে ভিন্নভাবে দেখেন সহকর্মীরা। মিরপুর ইমপেরিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, তিনি নিয়মিত স্কুলে আসতেন এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতেন।

শিক্ষক এম. এ. খায়ের বলেন, “তিনি খুবই চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। ব্যক্তিগত বিষয় খুব কমই শেয়ার করতেন।”

এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।