মস্কোর শপিংমলে নিরাপত্তাকর্মী, নির্মাণ প্রকল্পে মোটা বেতনের চাকরি। এমন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সংগ্রহ করা হয় তরুণদের। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বদলে যায় সবকিছু। চাকরির বদলে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন রণাঙ্গনে। ভয়ংকর সেই যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ হচ্ছেন লাশ, কেউ আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন চিকিৎসা শিবিরে, কেউ নিখোঁজ, আবার কেউ সেখান থেকেই ভিডিও বার্তায় দিচ্ছেন প্রতারণার বিভীষিকাময় বর্ণনা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতারণা নয়। বরং চাকরির আড়ালে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও ‘যুদ্ধ-বাণিজ্যের’ ভয়ংকর চক্র। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে ‘হক ইন্টারন্যাশনাল’সহ কয়েকটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান ও দালাল নেটওয়ার্কের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, হক ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ভিসা প্রসেসিং করা হলেও পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন জনৈক এসএম আরিফ চৌধুরী। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আরাফাত ও জালাল পাটোয়ারী। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা দালালদের মাধ্যমে বেকার তরুণদের সংগ্রহ করা হয়। তাদের সামনে তুলে ধরা হয় মাসে লাখ টাকা বেতনের চাকরির স্বপ্ন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরই শুরু হয় প্রতারণার দ্বিতীয় অধ্যায়।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মস্কোতে পৌঁছানোর পরপরই কর্মীদের পাসপোর্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় চক্রটি। এরপর তাদের এমন ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়- যারা রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য লোক সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর জোর করে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র। ন্যূনতম প্রশিক্ষণ শেষে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। যারা আপত্তি জানান, তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, অনেকের খাবার পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে নিজেদের দায় এড়িয়ে এসব অভিযোগ স্বীকার করেছে হক ইন্টারন্যাশনাল।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরির নামে বিদেশে পাঠানোর এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে ‘হক ইন্টারন্যাশনাল’। এই রিক্রুটিং এজেন্সি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে। তরুণদের মাসে লাখ টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এরপর ভিসা প্রসেসিং শেষ করে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু মস্কোতে পৌঁছানোর পরই কর্মীদের পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে তাদের রুশ সামরিক সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে স্থানান্তর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সোহেল রানা বর্তমানে রাশিয়ার যুদ্ধাঞ্চলে অবস্থান করছেন। ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে যে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কিছুই মেলেনি। তার ভাষ্য, ফ্লাইটের ঠিক আগে নতুন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। সেখানে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি নির্ধারণ করা হয় মাত্র ১ ডলার ৯০ সেন্ট। এমন সময় তাকে বিষয়টি জানানো হয়, যখন আর ফিরে আসার সুযোগ ছিল না।
সোহেলের দাবি, তারা সাতজন একসঙ্গে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তাদের তিনজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর, মাদারীপুরের সুরুজ কাজী এবং কুমিল্লার ইউসুফ মজুমদার। ভিডিও বার্তায় সোহেল অভিযোগ করেন, চাকরির নামে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট এজেন্সি হক ইন্টারন্যাশনাল, এসএম আরিফ চৌধুরী ও তার সহযোগী দালালচক্র।
অভিযোগের বিষয়ে হক ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইনামুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা কেবল সরকারি নিয়ম মেনে ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ করি’। তার ভাষ্য, কর্মী সংগ্রহ ও বিদেশে পাঠানোর অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এসএম আরিফ চৌধুরী ও তার সহযোগীরা। এরা সবাই দালাল বলে দাবি করেন ইনামুল হক। কতজন কর্মী তাদের মাধ্যমে রাশিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি ইনামুল। এদিকে এসএম আরিফ চৌধুরীর ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে জানান, চাকরির চুক্তিতে রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হতে হয়েছে। এর মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনা সামনে আসায় তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। যারা রাশিয়ায় বিপদগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন সরকার তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগে আর এস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮) এবং জাবাল-ই-নূর (আরএল-২৫০৫) এবং টিএস ওভারসিস লিমিটেড (আরএল-১৭৫৫) নামের তিন এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে বিএমইটি। তবে হক ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানেও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে পাঠানোর অভিযোগ উঠে এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু ট্রাভেল ও রিক্রুটিং নেটওয়ার্ক প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব পাঠায়। পরে সেখান থেকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে সামরিক কাজে বাধ্য করা হয়। যারা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাভিত্তিক কয়েকটি ভ্রমণ সংস্থা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। প্রথমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে রাশিয়ায় নেওয়া হয় তরুণদের। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের আর বেসামরিক চাকরিতে নেওয়া হয় না। বরং সামরিক ক্যাম্পে স্থানান্তর করে যুদ্ধের প্রস্তুতি দেওয়া হয়।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার হুমায়ুন কবির মাসে আড়াই লাখ টাকা বেতনের আশ্বাসে আঠারো লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে রাশিয়ায় পৌঁছেছিলেন সংসারে স্বচ্ছলতা আনার আশায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে বাধ্য করা হয় যুদ্ধে অংশ নিতে, কিছুদিন পরই পরিবার পায় তার মৃত্যুর খবর।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের পঁচিশ বছর বয়সি আকরাম হোসেনকে ওয়েল্ডার হিসেবে কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। নয় মাস পর তার পরিবার জানতে পারে, ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের বাসিন্দা আলী হাসান সোহেলকে নির্মাণ শ্রমিকের কাজের কথা বলে সাত লাখ টাকায় রাশিয়ায় পাঠানো হয়। বিমানবন্দরে নামার পরপরই তাকে হস্তান্তর করা হয় সেনাবাহিনীর কাছে, প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র হাতে পাঠানো হয় ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলে। ড্রোন হামলায় আহত হয়ে বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন, দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন পরিবারের কাছে। এমনই আরেকটি ঘটনায় রাজবাড়ীর অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য নজরুল ইসলামকে মস্কোর একটি শপিংমলে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে জোরপূর্বক তাকে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর পরিবার জানতে পারে তার মৃত্যুর খবর।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক অনুসন্ধানেও একই চিত্র উঠে এসেছে। লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান ও মুন্সীগঞ্জের মোহন মিয়াজীসহ কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়, এরপর ড্রোন যুদ্ধ ও ভারী অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিবাদ জানালে এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেন, দালালরাই তাদের বিক্রি করে দিয়েছে। এপির অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, কেউ কেউ বৈদ্যুতিক কাজের অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে ড্রোন ইউনিটে নিয়োগের প্রলোভনে পড়েছিলেন, আর অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে নির্যাতনের, এমনকি মৃতদেহ সংগ্রহের কাজেও বাধ্য করা হয়েছে।
সিআইডির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাভিত্তিক কিছু ভ্রমণ সংস্থা এই চক্রে জড়িত। দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের প্রথমে নেওয়া হয় ওমরাহ ভিসায়। পরে তাদের তুলে দেওয়া হয় রাশিয়ায় থাকা দালালদের হাতে। এরপরই তাদের নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ার সামরিক ছাউনিতে। যারা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের কপালে জোটে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সরকারি সূত্র বলছে, বৈধ চ্যানেলে গত কয়েক বছরে প্রায় ১২০০ কর্মী রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে, যারা নিরাপদ। অর্থাৎ, সংকটটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়, বরং বেসরকারি দালাল ও অসাধু ভ্রমণ সংস্থার নিয়ন্ত্রিত অবৈধ পথে। জনশক্তি ব্যুরোর তদারকির ফাঁকফোকর গলে এই অপরাধীরা কীভাবে সক্রিয় থাকছে, তা এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

