ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বাম্পার ফলনেও কৃষকের কান্না, পচনে সর্বস্বান্ত কৃষক

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দাম পাওয়া যাবে- এমন বুকভরা আশা নিয়ে ফসল ঘরে তুলেছেন কৃষকেরা। কিন্তু বিধিবাম, শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা ঝিনাইদহের শৈলকুপার প্রান্তিক চাষিদের। বাজারে বিক্রি করতে না পেরে এবং ঘরে রাখার কিছুদিনের মধ্যেই দ্রুত পচন ধরায় হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ ডোবা, নালা ও খালে ফেলে দিচ্ছেন তারা। আমদানিকৃত নাসিক জাতের বীজ ও কিছু হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজে বেশি পঁচন ধরেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে পচা পেঁয়াজের দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। শত শত কৃষক ও ব্যবসায়ী পরিবারের এখন দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শৈলকুপা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমিতে ভারতীয় নাসিক ও হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের চাষ হয়। দেখতে আপেলের মতো বড় ও উজ্জ্বল লালচে রঙের এই পেঁয়াজগুলোর ফলন অনেক বেশি হলেও এগুলো মূলত দ্রুত পচনশীল ও সংরক্ষণের অযোগ্য।

এ বছর মৌসুমের শুরুতেই রোপণ শ্রমিক, সার ও কীটনাশক সংকটে পড়েন শৈলকুপার কৃষকেরা। সারের কৃত্রিম সংকটের কারণে ডিএপি সার চাষিদের কিনতে হয়েছিল প্রায় দ্বিগুণ দামে। ফলে প্রয়োজনীয় সার ও ওষুধ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গিয়েছিল।

শৈলকুপা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ বছর শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে (যা গত বছরের চেয়ে ৮০৫ হেক্টর বেশি)। উপজেলায় মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টনেরও বেশি।

তবে বাম্পার ফলন হলেও তা এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে সুখসাগর বা দেশি ভালো জাতের পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও, নাসিক জাতের এই পেঁয়াজ প্রতি মণ ১০০ থেকে ২০০ টাকাতেও কেউ কিনছে না।

মনোহরপুর গ্রামের প্রান্তিক চাষি রাজন হোসেন জানান, তার ২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ লাগিয়ে খুব ভালো ফলন হয়েছিল। কিন্তু পেঁয়াজ তোলার পর বাড়িতে রাখার কয়েকদিনের মধ্যেই সেগুলোতে পচন ধরে। রাজনের ঘরের ২০০ মণেরও বেশি পেঁয়াজ এখন খালের পানিতে। একই পরিবারের ৪ কৃষকের প্রায় ৬০০ মণ পেঁয়াজ পচে যাওয়ায় পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে।

অন্তর হোসেন নামের আরেক কৃষক জানান, ৬ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন তিনি। ৬০০ মণ পেঁয়াজের মধ্যে ২০০ মণই পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বাকিগুলো নিয়েও শঙ্কিত তিনি। এ ছাড়াও ধলহরাচন্দ্র গ্রামের এক কৃষক তার উৎপাদিত ১৫০ মণ পেঁয়াজ পাশের ডোবায় ফেলে দিয়েছেন।

লিয়াকত জোয়ার্দার নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৬শ মণ পেঁয়াজ ক্রয় করেছিলেন। অর্ধেকের বেশি পচে গেছে। যতটুকু আছে যেগুলাও বিক্রয়ের অযোগ্য। অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। পচনের কারণ হিসেবে তিনি অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি, ভেজাল বীজ ও হাইব্রিড জাতের কথা উল্লেখ করেন।

শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, ভরা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাত, জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং মূলত হাইব্রিড ও নাসিক জাতের পেঁয়াজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে এই পচন। চাষিদের এই জাতের পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।