ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোর বিপক্ষে লিওনেল মেসির গল্পটা বরাবরই দাপটের। আর্সেনাল থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবা ম্যানচেস্টার সিটি ইংলিশ প্রতিপক্ষ পেলেই যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। অথচ দুই দশকের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে কখনো খেলা হয়নি তার। এবার সেই অপূর্ণ অধ্যায়টি পূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। আর তাতেই প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে ইংলিশদের বিপক্ষে নামতে যাচ্ছেন মেসিরা।
ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে তার পরিসংখ্যানই প্রতিপক্ষের জন্য সতর্কবার্তা। ৩৫ ম্যাচে ২৭ গোল করেছেন মেসি। তবে এসব ম্যাচের মধ্যে ২০১০ সালে আর্সেনালের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের রাতটি আলাদা জায়গা নিয়ে আছে।
বার্সেলোনার মাঠে সেদিন আর্সেনালকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল কাতালানরা। চারটি গোলই এসেছিল মেসির পা থেকে। তার একক নৈপুণ্যে ইউরোপিয়ান আসর থেকে ছিটকে যায় ইংলিশ ক্লাবটি। ম্যাচ শেষে মেসিকে নিয়ে বিস্ময় লুকাতে পারেননি আর্সেনালের তৎকালীন কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। আর্জেন্টাইন তারকাকে ‘প্লে স্টেশনে’র খেলোয়াড়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন তিনি। ওয়েঙ্গারের চোখে, প্রতিপক্ষের সামান্য ভুলও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল মেসির।
ক্লাব ফুটবলে ইংলিশদের নিয়মিত প্রতিপক্ষ হলেও জাতীয় দলের ক্ষেত্রে গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির না খেলার শুরু ২০০৫ সালের একটি ঘটনা দিয়ে।
সে বছর জেনেভায় প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন না তখনকার কিশোর মেসি। এর মাত্র তিন মাস আগে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল তার।
সেই অভিষেক অবশ্য সুখকর ছিল না। বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মেসি। প্রতিপক্ষের বাধা এড়াতে গিয়ে কনুই ব্যবহারের ঘটনায় তাকে সরাসরি মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি। সেই নিষেধাজ্ঞাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার প্রথম সম্ভাবনাটি শেষ করে দেয়। জেনেভার ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড।
অথচ বিশ্বকাপ ইতিহাসে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। ১৯৬৬ সালের পর ১৯৮৬, ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর অন্যতম সেরা গোলের কারণে ১৯৮৬ সালের ম্যাচটি এখনো ফুটবল ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায়।
দুই দলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০২ সালে। গ্রুপপর্বের সেই ম্যাচে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি থেকে করা গোলে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। এরপর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বকাপে আর মুখোমুখি হয়নি তারা।
এই দীর্ঘ বিরতির পেছনে ফুটবলের বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক সূচি বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের সঙ্গে আলাপে তার কিছু কারণ তুলে ধরেছেন ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, উয়েফা নেশনস লিগ চালু হওয়ার পর ইউরোপের দলগুলোর জন্য অন্য মহাদেশের দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ অনেকটাই কমেছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে ব্যস্ত থাকে। প্রীতি ম্যাচের জন্য দেশটির ফুটবলকর্তাদের পছন্দ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকার মতো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক অঞ্চল। বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার ম্যাচ আয়োজনের খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, স্পনসরশিপ থেকে বছরে আট কোটি ডলারের বেশি আয় করে আর্জেন্টিনা ফুটবল। একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতেই তাদের দিতে হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ ডলার। এই বিপুল বাণিজ্যিক মূল্যের কেন্দ্রে যে মেসি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চুক্তিতে তার জন্য আলাদা ফি উল্লেখ না থাকলেও মেসির উপস্থিতিই আয়োজকদের কাছে আর্জেন্টিনা দলকে আরও দামি করে তোলে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে একটি চুক্তিভঙ্গের মামলাতেও মেসির উপস্থিতির বাণিজ্যিক গুরুত্ব সামনে এসেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, একটি প্রদর্শনী ম্যাচে অন্তত ৩০ মিনিট মেসির খেলার শর্ত থাকলেও তিনি মাঠে নামেননি। পরদিন ইন্টার মিয়ামির গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ থাকায় তাকে খেলানো হয়নি বলে জানা যায়।
এ নিয়ে মেসি ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। এএফএ অবশ্য দাবি করেছে, চুক্তির সব শর্ত তারা যথাযথভাবে পালন করেছে।
এর মধ্যেই সংস্থাটির আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তদন্তের খবর প্রকাশ হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ঘিরে এএফএর কিছু ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আর্জেন্টিনা ফুটবল কর্তৃপক্ষ মনে করিয়ে দিয়েছে, তদন্ত শুরু হওয়া মানেই কোনো অপরাধ প্রমাণ হওয়া নয়।
এসব বিতর্ক সাম্প্রতিক। মেসি ও ইংল্যান্ডের এত বছর মুখোমুখি না হওয়ার সঙ্গে এগুলোর সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার ফুটবলপ্রেমীরা পেতে যাচ্ছেন বহু প্রতীক্ষিত এক লড়াই।
আটলান্টায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সামনে দাঁড়াবে আর্জেন্টিনা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি এবারের আসরে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। ৮ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও ২ গোল করিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে সেমিফাইনালে পৌঁছালেও আর্জেন্টিনার খেলায় কিছু দুর্বলতা চোখে পড়েছে। সেই জায়গাগুলো কাজে লাগিয়েই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের থামানোর স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড। ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে বহু স্মরণীয় রাত উপহার দিয়েছেন মেসি। এবার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের জাতীয় দল। ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে এসে তাই নতুন এক পরীক্ষার সামনে আর্জেন্টাইন জাদুকর।

