গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অনেক পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে এসি ছাড়া স্বস্তিতে থাকা অনেকের জন্যই কঠিন। তবে নতুন এসি কেনার সময় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে। অনেকেই এসি ব্যবহারের পর অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ বিল পেয়ে অবাক হন। অথচ কিছু মৌলিক তথ্য জানা থাকলে এসির প্রকৃত খরচ বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সঠিক মডেল নির্বাচন করা অনেক সহজ।
বাংলাদেশে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ করা হয় স্তরভিত্তিক বা স্ল্যাব রেট পদ্ধতিতে। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রথম ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম ৩.৭৫ টাকা। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ৫.১৪ টাকা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৫.৩৬ টাকা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৬.৩৪ টাকা এবং ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম ৯.৯৪ টাকা। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের অধিকাংশ শহুরে পরিবার গ্রীষ্মকালে নিয়মিত এসি ব্যবহারের কারণে উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যায়। তাই এসি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে গড়ে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ধরে বিদ্যুৎ খরচের হিসাব করাকে বাস্তবসম্মত ধরা হয়।
এসি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ইনভার্টার ও নন-ইনভার্টার প্রযুক্তির পার্থক্য। প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা, অর্থাৎ মাসে ২৪০ ঘণ্টা ব্যবহারের হিসাবে একটি ১ টন নন-ইনভার্টার এসি প্রায় ২৮৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যার মাসিক খরচ প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা। একইভাবে ১.৫ টন নন-ইনভার্টার এসির খরচ প্রায় ৩ হাজার ২৬৪ টাকা এবং ২ টন নন-ইনভার্টার এসির খরচ প্রায় ৪ হাজার ২২৪ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, ইনভার্টার প্রযুক্তির এসিগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। একটি ১ টন ইনভার্টার এসি মাসে প্রায় ১৬৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যার আনুমানিক খরচ ১ হাজার ৩৪৪ টাকা। ১.৫ টন ইনভার্টার এসির ক্ষেত্রে মাসিক খরচ প্রায় ২ হাজার ১৬ টাকা এবং ২ টন ইনভার্টার এসির ক্ষেত্রে প্রায় ২ হাজার ৫৯২ টাকা। ফলে একই ক্ষমতার নন-ইনভার্টার এসির তুলনায় একটি ইনভার্টার এসি প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ আরও বেশি। একটি এসির গড় আয়ুষ্কাল পাঁচ বছর ধরে হিসাব করলে ইনভার্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রেই এই সাশ্রয়ের পরিমাণ ইনভার্টার ও নন-ইনভার্টার এসির দামের পার্থক্যের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। তাই শুরুতে কিছুটা বেশি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ইনভার্টার এসি অধিক লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে শুধু সঠিক এসি নির্বাচন করলেই হবে না, ব্যবহারেও কিছু সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পরিবর্তে ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখলে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। কারণ প্রতি ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা কমালে বিদ্যুৎ খরচ ৬ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে রাতে স্লিপ মোড ব্যবহার করলে এসি ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ায়, ফলে অপ্রয়োজনীয় কুলিং কম হয় এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
এ ছাড়া ঘরের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখা জরুরি। বাইরে থেকে গরম বাতাস ঢুকলে এবং ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বের হয়ে গেলে এসিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত এসির ফিল্টার পরিষ্কার করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি দুই সপ্তাহে অন্তত একবার ফিল্টার পরিষ্কার করলে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং বিদ্যুৎ অপচয় কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, ময়লা জমে থাকা ফিল্টারের কারণে বিদ্যুৎ খরচ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
সিলিং ফ্যানের সঙ্গে এসি ব্যবহার করাও একটি কার্যকর কৌশল। ফ্যান ঘরের ঠান্ডা বাতাস দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, ফলে এসির তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বেশি রেখেও একই ধরনের আরাম পাওয়া যায়। এর ফলে বিদ্যুৎ খরচ কমে এবং এসির ওপর চাপও কম পড়ে।
সব মিলিয়ে, এসি কেনার সময় শুধু এর দাম নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ খরচের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সঠিক ক্ষমতার ইনভার্টার এসি নির্বাচন এবং সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে গরমের দিনে আরাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাসিক বিদ্যুৎ বিলও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ফলে এসি ব্যবহারের সুবিধা উপভোগ করেও অযাচিত খরচের চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

