ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

সীমান্তে পুশইনের নামে বিএসএফের উৎপাত

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৫:১৮ এএম

দেশের সীমান্ত দিয়ে পুশইনের নামে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) উৎপাত বেড়েই চলেছে। তবে ১১টি সীমান্তবর্তী জেলায় এই অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টাগুলো প্রতিনিয়ত রুখে দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন তারা। প্রস্তুত রয়েছেন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায়। এদিকে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে কয়েকদিন ধরে পিছু হটছে বিএসএফ। তিন দিন পরে সীমান্তের শূন্যরেখায় থাকা ২১ জন ভারতীয় নাগরিককে অবশেষে গতকাল সোমবার ভোররাতে লাইট বন্ধ করে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে পুশইনের নামে উৎপাত চালাচ্ছে পাশর্^বর্তী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত ১০ দিন ধরে বিএসএফের ক্রমাগত উস্কানি ও পুশইনের মরিয়া চেষ্টা দুই দেশের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এই উস্কানি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে গত শুক্রবার ভোররাতে বিএসএফ ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে জিরো লাইনে ফেলে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবির অনড় অবস্থান ও এলাকাবাসীর বাধার মুখে তারা প্রায় ৭০ ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকার পর অবশেষে গভীর রাতে ফ্লাডলাইট বন্ধ করে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। গত কয়েকদিনে ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও লালমনিরহাটের একাধিক পয়েন্টে বিজিবির কঠোর হুঁশিয়ারি ও জনতার ঢলের মুখে বিএসএফ অবৈধভাবে নিয়ে আসা মানুষদের প্রিজন ভ্যান বা গাড়িতে করে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিএসএফ মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অজুহাতে বাংলাভাষী মানুষদের জড়ো করে রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক কাঁটাতারের গেট খুলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকার ও বিজিবি বলছে, বিএসএফের আন্তর্জাতিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো অপৎপরতা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। প্রায় ১০ দিন ধরে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। তবে এত সাড়া না দিয়ে চরম সহিষ্ণুতা দেখিয়ে যাচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে অবৈধ ‘পুশইন’ বা জোর করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো বা পুশব্যাকের নামে বিএসএফ দীর্ঘদিন ধরে নানা উৎপাত ও উত্তেজনা তৈরি করে আসছে। গত ৩১ মে থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের পক্ষ থেকে রাতের আঁধারে কাঁটাতারের গেট খুলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে। বিজিবি এবং স্থানীয় জনসাধারণের অভূতপূর্ব যৌথ প্রতিরোধের মুখে ভারতের বিএসএফের সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ প্রচেষ্টাগুলো একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও সাধারণ মানুষ এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে।

এদিকে, ভারতকে ‘পুশইন’ নয়, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, পুশইন ঠেকাতে ভারতকে ১২-১৩টি চিঠি দিয়েছে সরকার। পুশইন দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, গতকাল থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে। চার দিনব্যাপী (৮ থেকে ১১ জুন) এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি ভারতের নতুন দিল্লির সিজিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত বিএসএফ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সীমান্তে সাম্প্রতিক চরম উত্তেজনা ও পুশইন চেষ্টার কারণে এবারের সম্মেলনটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অবৈধভাবে পুশইন দুই দেশের কূঠনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সম্মেলনে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের এই অনৈতিক ও জোরপূর্বক পুশইন প্রচেষ্টা এবং সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কড়া প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।

গত ৪ থেকে ৬ জুনের মধ্যে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, নওগাঁ, সিলেট ও নেত্রকোনাসহ ১০টি ভিন্ন ভিন্ন সংবেদনশীল সীমান্ত পয়েন্টে বিএসএফ একই কায়দায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। বিজিবির গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে বিএসএফ ক্যাম্প সংলগ্ন বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে আরও বহু মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে বাংলাদেশে পুশইন করার উস্কানিমূলক উদ্দেশ্যে। বিএসএফের এই টানা উস্কানির মুখে বিজিবি সদর দপ্তর সারা দেশের প্রায় ৭০টি পয়েন্টকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে কড়া প্রহরা বসিয়েছে।

তথ্য অনুসারে, গত মাসের শেষ দিনে আচমকা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। রাতের আঁধারে বা ভোরবেলা হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক জিরো লাইনে বা কাঁটাতারের গেট খুলে লোকজনকে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা গভীর আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন। অনেক জায়গায় পুশইন ঠেকাতে স্থানীয়রা রাত জেগে পাহারা বসাতে বাধ্য হচ্ছেন। গোয়েন্দা এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টা রুখে দেয়। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রায়শই বিজিবি ও বিএসএফের মাঝে কোম্পানি কমান্ডার বা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভারতীয় অংশে কাঁটাতারের লম্বা বেড়া দিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখলেও বাংলাদেশের দিকে এ ধরনের কোনো কাঁটাতারের বেড়া বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে প্রায়ই ভারতের সীমান্তরক্ষীরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে পুশইন করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। দেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে অভূতপূর্ব কড়া নজরদারি এবং নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। চলমান সংকট মোকাবিলায় বিজিবি তাদের টহল ব্যবস্থা এবং নজরদারিতে আধুনিক ও কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে।

সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের গুলি ও নির্যাতন বন্ধে ‘শূন্য সীমান্ত হত্যা’ নীতি বাস্তবায়নে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জিরো লাইনের ১৫০ গজের ভেতর বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের একতরফা চেষ্টা বন্ধের দাবি তোলা হচ্ছে। অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচার রোধে দুই দেশের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, তারা কেবল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশ এর জবাবে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করে বিএসএফের বেআইনি পুশইন কৌশলের তীব্র বিরোধিতা করছে। বিএসএফের একের পর এক উস্কানি ও জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানোর মরিয়া চেষ্টার মুখে বিজিবি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাদারিত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে চরম সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য প্রদর্শন করছে। কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত বা সংঘাতে না জড়িয়ে, বিজিবি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কিন্তু কঠোর আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থানে থেকে সীমান্ত রক্ষা করছে।

বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের আগে শূন্যরেখা খালি করল ভারত : বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শূন্যরেখায় আটকে থাকা সব নাগরিককে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গতকাল সোমবার ভারতের অভ্যন্তরে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

সর্বশেষ ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের সীমান্ত এলাকার শূন্যরেখায় তিন দিন ধরে আটকে রাখার পর গতকাল ২১ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। এর মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্ত এলাকার শূন্যরেখায় বর্তমানে আর কেউ আটকে নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশে বিএসএফের ক্যাম্প সদৃশ ঘর রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ধরে আনা ব্যক্তিদের এসব ক্যাম্পে জড়ো করা হয়। পরবর্তীতে রাতের আঁধারে বা জনশূন্য অবস্থায় সুযোগ বুঝে তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার হরিপুর সীমান্তে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ।

অনুপ্রবেশে ব্যর্থ হয়ে টানা তিন দিন ধরে ওই ১১ জনকে শূন্যরেখায় আটকে রাখে বিএসএফ। একই সময়ে পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়েও ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবির বাধায় তারা সেখানে আটকে থাকে। দুই সীমান্ত মিলিয়ে মোট ২১ জন তীব্র মানবিক সংকটের মুখে পড়েন। সীমান্তের উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পিছু হটে। গতকাল সকালে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ২১ জনকেই বিএসএফ তাদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিয়ে ক্যাম্প থেকে সরিয়ে দেয়। বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে।

বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাতের অন্ধকারে বিএসএফ যাতে লোক ঠেলে দিতে না পারে, সেজন্য কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, মেহেরপুর ও হিলি সীমান্তে থার্মাল ইমেজিং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ওপারে বিএসএফের যেকোনো ধরনের মুভমেন্ট বা লোক জড়ো করার দৃশ্য কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেই শনাক্ত করা যাচ্ছে। সীমান্তের সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে হাই-ডেফিনিশন নাইট ভিশন ক্যামেরা ও সিসিটিভি নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা সরাসরি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হচ্ছে। দেশের প্রায় ৭০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ছুটি বাতিল করে সীমান্ত চৌকিগুলোতে (বিওপি) সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

সীমান্তের ১১ জেলায় আনসার মোতায়েন : সীমান্তবর্তী ১১ জেলায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপপরিচালক (গণসংযোগ) মো. আশিকউজ্জামান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে ২০২৫ সালে সই করা সমঝোতা স্মারকের আওতায় সীমান্ত এলাকায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও সমন্বিত এবং কার্যকর হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ও নিরাপত্তাগত চাহিদার প্রেক্ষাপটে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্তবর্তী ১১টি জেলাগুলো হলোÑ চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়ি।

বিজিবির চরম সহিষ্ণু ও দায়িত্বশীল নীতির বিষয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তারা নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একদিকে দেশের মানুষ বিজিবির দেশপ্রেম ও অনড় অবস্থানকে স্যালুট জানাচ্ছে, অন্যদিকে বিএসএফের ক্রমাগত উস্কানির মুখে কেবল সহিষ্ণুতা দেখানোয় এক ধরনের ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ রাতের অন্ধকারে নারী ও শিশুদের জিরো লাইনে ফেলে রাখার মতো বিএসএফের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এ ছাড়াও শুধু বিজিবির ওপর ভরসা করে বসে না থেকে, সীমান্ত এলাকার মানুষ নিজেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

সীমান্ত এলাকাগুলোতে এখন  গ্রামের তরুণ, যুবক ও প্রবীণরা মিলে ছোট ছোট দল বা স্কোয়াড গঠন করেছেন। তারা মূলত রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত যে সময়টাতে বিএসএফ পুশইনের সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করে- তখন লাঠি, টর্চলাইট ও বাঁশি হাতে জিরো লাইনের কাছাকাছি কাঁচা রাস্তা বা ফসলের ক্ষেতের পাশে টহল দেন। এক দল পাহারা দিয়ে বাড়ি ফিরলে অন্য দল দায়িত্ব নেয়। পুরুষরা যখন সীমান্তে পাহারায় থাকেন, ঘরের নারীরা তখন নিজ নিজ বাড়ির ভেতরে বা উঠানে সতর্ক অবস্থান নেন। কোনো কোনো সীমান্তবর্তী গ্রামে নারীরাও শুকনো মরিচের গুঁড়ো বা গরম পানি তৈরি করে রাখার মতো মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন, যেন যেকোনো জরুরি বা চরম পরিস্থিতিতে তারা পুরুষদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। বিজিবির সাথে সার্বক্ষণিক সমন্বয়গ্রামবাসীদের এই পাহারা কিন্তু বিশৃঙ্খল নয়, বরং বিজিবির সাথে সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ের মাধ্যমে চলছে। প্রতিটি পাহারাদার দলের কাছে স্থানীয় বিওপি বা বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার।

৪৮০০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর দাবি শুভেন্দু অধিকারীর : পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলোতে গড়ে তোলা আটককেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৮০০ অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়া আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে ‘নিজ দেশে’ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। গত রোববার বিজেপির একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রস্তুতি সভায় দেওয়া বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত করা তার সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। খবর ইন্ডিয়া টুডের।

ওই অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্যের যে ৫৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় এখনো কোনো বেড়া নেই, তার মধ্যে প্রায় ১০০ কিলোমিটার অংশে বেড়া দেওয়ার জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে (বিএসএফ) ইতোমধ্যে জমি হস্তান্তর করেছে রাজ্য সরকার। তিনি উল্লেখ করেন, জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ অংশটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, বিজেপির এই ধরনের বক্তব্য ও নীতিমালা ভারতের ২০ কোটির বেশি মুসলমানের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, দলটি মূলত ধর্মীয় পরিচয়কে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে একাকার করে দেখছে। পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও অভিযোগ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারত সরকার শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে।