দেশে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। এতে ব্যাপকভাবে বাড়ছে প্রজনন সমস্যা, গর্ভপাত এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি। বায়ুদূষণে অসুস্থতার ফলে বছরে হারাতে হচ্ছে ২৬৩ মিলিয়ন কর্মদিবস। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনসহ বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। অবৈধ ইটভাটা, ব্যাটারি পোড়াতে সিসার ব্যবহার, নির্মাণকাজের ধুলোবালি, বর্জ্য পোড়ানো ও শিল্প-কারখানার বর্জ্যসহ প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত দূষিত বায়ুতে নি¤œগামী বায়ুর মান। দূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাতাসে যেন মৃত্যুদূত হাতছানি দিচ্ছে।
মানবদেহের বিরূপ প্রভাব আবহাওয়া ও জলবায়ুতে পড়ছে। এতে দেশের বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। ফলে কোথাও অনাবৃষ্টি, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি বা খরার মতো চরম অবস্থা তৈরি করছে। যার ফল এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ করা যাচ্ছে।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) এক গবেষণা বলছে, দেশে বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রতিবছর পাঁচ হাজার ২৫৮ শিশুসহ এক লাখ দুই হাজার ৪৫৬ জন মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবছর ৯ লাখ মায়ের অকাল প্রসব হচ্ছে এবং প্রায় সাত লাখ কম ওজনের শিশু জন্মগ্রহণ করছে। আর এ-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে প্রতিবছর ছয় লাখ ৭০ হাজার রোগী জরুরি বিভাগে ভর্তি হচ্ছেন। যার ফলে সম্মিলিতভাবে বছরে ২৬৩ মিলিয়ন কর্মদিবস হারাচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধÑ সবাই বায়ুদূষণের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং দিন দিন এই স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো আরও বেড়ে চলছে।
উল্লেখ্য, দেশের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বালুকণার বার্ষিক মান ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম; যা বার্ষিক জাতীয় মানদ- ৩৫ মাইক্রোগ্রামের দ্বিগুণের বেশি। উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত ক্ষুদ্র বস্তুকণা, সিসা, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ নানা দূষক মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টি করছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দূষক উৎসগুলো সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং আন্তঃসীমান্ত দূষণ রোধে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনার সঙ্গে কঠোর নজরদারি দরকার।
বাংলাদেশ এখন বিশে^ বায়ুদূষণে অন্যতম। বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও দেশের নিজস্ব মানদ-ের চেয়ে বহুগুণে বেশি। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষই এমন এলাকায় বাস করছেÑ যেখানে বাতাস ডব্লিউএইচও’র মানদ-ের তুলনায় মারাত্মকভাবে দূষিত। দেশের সবচেয়ে কম দূষিত জেলা লালমনিরহাটেও বায়ুর মান ডব্লিউএইচও’র মানদ-ের চেয়ে সাতগুণ বেশি দূষিত।
সারা দেশে প্রায় ৭০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটো ও ভ্যান রয়েছে। এসব যানে গড়ে তিনটি থেকে চারটি ব্যাটারি লাগানো হয়। সেক্ষেত্রে মোট সচল ব্যাটারির সংখ্যা দুই থেকে প্রায় তিন কোটি। প্রতিদিন সারা দেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার ব্যাটারি বাতিল বা নষ্ট হচ্ছে। এসব ব্যাটারি পোড়ানো হচ্ছে রাজধানীর আশপাশসহ বিভিন্ন জেলা শহরে।
সরেজমিনে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর ও ধামরাই ঘুরে গোপন ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানা সম্পর্কে জানা গেছে। এসব কারখানায় পরিত্যক্ত ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি করা হয়। পরে সেই সিসা দিয়ে আবার ব্যাটারি তৈরি করা হয়।
জানা গেছে, হেমায়েতপুরের বিভিন্ন কারখানা, ভাঙারি দোকানের আড়ালে এবং রিকশা মেরামতের গ্যারেজের ভেতরে রয়েছে ছোট ছোট কারখানা। আবাসিক এলাকা এবং শিল্প জোনের মধ্যে হওয়ায় এসব কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও উৎকট গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন এলাকাবাসী। একাধিকবার অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হলেও ধামরাই উপজেলার ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের মালঞ্চ ও সুতিপাড়া ইউনিয়নের বেলিশ^র এলাকায় এখনো চলছে কারখানা।
সাভারের স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘সাভার, আমিনবাজার ধামরাইয়ের নানা স্থানে ব্যাটারি পোড়ানো হয়। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোও চলছে। দুয়েকবার অভিযান চললেও কিছুদিন পরই আবার চালু হয়।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আবাসিক এলাকায় বা অনুমোদনহীন যেকোনো জায়গায় সিসা কারখানা পরিচালনার সুযোগ নেই। আমরা ইতিপূর্বে তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি কারখানার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তৌহিদ-আল-হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সিসা তৈরির ধোঁয়া মানবদেহে প্রবেশ করলে মাথাব্যথা, শ^াসকষ্ট, ফুসফুসে ক্যানসার, মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিসহ নানা সমস্যা হতে পারে। এমনকি মানসিক বিকৃতি ও রক্তশূন্যতাও হতে পারে। সাভার এলাকায় এগুলোর সঙ্গে ইটাভাটার ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য এবং বর্জ্য পোড়ানোর কারণে বাতাস নিয়মিত দূষিত হচ্ছে।’
শুধু সাভার ও ধামরাই-ই নয়, সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী তীরবর্তী এলাকা এবং কৃষি জমিতে চলছে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা গলানোর গোপন কারখানা। যার মধ্যে রয়েছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ঘাটের পদ্মা নদীর পাড়, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব বিশ^ রোড।
স্ব্যস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নষ্ট ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা (লেড) তৈরির সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও সালফিউরিক এসিড বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
অন্যদিকে দেশে অবৈধ ইটভাটা রয়েছে পাঁচ হাজার ৯২টি। এই ইটভাটাগুলো তীব্র পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি শিল্প কারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের কার্যকর বৈজ্ঞানিক পন্থা পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বাধ্যতামূলক করা হলেও বেশির ভাগ কারখানা এ আইন বা বৈজ্ঞানিক নিয়ম মানছে না। ফলে কারখানাগুলোর বিষাক্ত ও রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদী ও জলাশয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া গ্যাস ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে বায়ু নিয়ন্ত্রণ ডিভাইস ব্যবহার হয় না। এতে কারখানার চিমনি থেকে বের হওয়া বিষাক্ত গ্যাস ও ধূলিকণা বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
শীতে বাংলাদেশে উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে বায়ুপ্রবাহের কারণে প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে প্রচুর দূষিত বায়ু আসে। দূষিত বাতাসের সিংহ ভাগ আসে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি এবং বিহার থেকে। শীতের শুরুতে এসব অঞ্চলে ব্যাপক হারে খড় ও ফসলের গোড়া পোড়ানো হয়, পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কলকারখানার সৃষ্ট ধোঁয়া প্রবেশ করে; যা রাজশাহী, খুলনা এবং ঢাকা অঞ্চলের ওপরে পড়ে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটান থেকে দূষিত বায়ু দেশের উত্তর অঞ্চলে প্রবেশ করে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের বাতাসের মান উদ্বেগজনক। শিল্প-কারখানার নির্গমন, কৃষি বর্জ্য পোড়ানো, ব্যাটারির সিসা, ঘরোয়া জ্বালানি ব্যবহার, ইটভাটা ও ধান সিদ্ধ শিল্পসহ বিভিন্ন উৎস এর জন্য দায়ী। সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে অবৈধ কারখানায় ব্যাটারি গলানোর ফলে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসা ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।’
সরকারের করণীয় দিক উল্লেখ করে ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্প-কারখানাকে পরিবেশগত বিধির আওতায় আনা, বৈজ্ঞানিকভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দূষিত বায়ু নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, ‘বাতাসের মাধ্যমে সিসা মানবদেহে প্রবেশ করলে তা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে গ্যাসীয় দূষকের চেয়ে সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পার্টিকুলেট ম্যাটার) বেশি উদ্বেগের কারণ। বর্তমানে বায়ুমানের অবনতির অন্যতম কারণ এই সূক্ষ্ম কণাদূষণ, যা ব্যাটারি ও অন্যান্য বর্জ্য পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন ধোঁয়ার কারণে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বায়ুদূষণ রাতারাতি কমানো সম্ভব নয়। দূষণ রোধে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ করছে সরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্জ্য পোড়ানো বায়ুদূষণের একটি বড় উৎস। বৃষ্টি হলে বাতাসের ইনডেক্স ভালো থাকার সম্ভাবনা থাকলেও আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া রাজধানীতে প্রবেশ করে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই জনসচেতনতার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগোতে হবে।’

