ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলাচ্ছে পুলিশ

ইকবাল হাসান ফরিদ
প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০১:০৪ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

এক সময় একটি সাধারণ জিডি করতে থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেতে লেগে যেত কয়েক দিন। আবার কখনো কয়েক সপ্তাহ। অপরাধ তদন্তের বড় অংশ নির্ভর করত সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি এবং সোর্সনির্ভর তথ্যের ওপর। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে পুলিশের কাজের ধরনও। কিন্তু জনবান্ধব পুলিশ তৈরির যে দীর্ঘদিনের চেষ্টা, তা বাস্তবায়ন এখনো কতদূর- এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জনবান্ধব পুলিশিং আটকে আছে রাজনীতির অদৃশ্য দেয়ালে।

জানা গেছে, অনলাইন জিডি, ডিজিটাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, সাইবার ক্রাইম তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণের মতো উদ্যোগ পুলিশের সেবাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। ফলে সেবা পাওয়ার সময় কমেছে। তদন্তের গতি বেড়েছে এবং অপরাধ শনাক্ত করাও সহজ হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ধাপে ধাপে চালু করা হয়েছে একাধিক ডিজিটাল সেবা। বর্তমানে মোবাইল ফোনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র হারানোর মতো বিভিন্ন বিষয়ে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা যাচ্ছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন, ফি পরিশোধ ও সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও হয়েছে ডিজিটাল।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চালুর পর দুর্ঘটনা, সহিংসতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষ দ্রুত পুলিশের সহায়তা পাচ্ছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা, সিসিটিভি মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি।

একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ভবিষ্যতের পুলিশিং হবে আরও বেশি ডেটানির্ভর। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু তদন্ত নয়, বরং আগে থেকেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনই এখন প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষ্য, এক সময় পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড। এখন অপরাধের বড় অংশ ঘটছে ভার্চুয়াল জগতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। বিদেশে বসে পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানবপাচার এবং সাইবার জালিয়াতি।

সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অপরাধীরা এখন শুধু অস্ত্র নয়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া আধুনিক পুলিশিং কল্পনা করা যায় না। এই বাস্তবতায় গড়ে তোলা হয়েছে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশন এবং আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক সুবিধা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দশকের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হবে সাইবার অপরাধ। তাই দক্ষ সাইবার জনবল তৈরি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওমানপ্রবাসী এক বাংলাদেশির কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে তারা তার দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ করে।

ভুক্তভোগীর এক স্বজন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করলে তদন্তভার যায় সিআইডির কাছে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানান, তদন্তে বেরিয়ে আসে দেশের ভেতর থেকেই একটি চক্র ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছিল। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরে চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সম্প্রতি বিআরটিএর ওয়েবসাইট ক্লোন করে এআইভিত্তিক ট্রাফিক জরিমানার নামে প্রতারণা চালানো একটি চক্রকেও প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

অন্যদিকে অনলাইনে ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎকারী একটি চক্রকে ডিজিটাল লেনদেন, আইপি লগ ও অনলাইন যোগাযোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করে পুলিশের সাইবার ইউনিট।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলেন, আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ছাড়া এ ধরনের অপরাধ উদ্ঘাটন প্রায় অসম্ভব।

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, বাংলাদেশে এক সময় অধিকাংশ তদন্তই ছিল সাক্ষ্যনির্ভর। এখন ডিএনএ পরীক্ষা, ডিজিটাল ফরেনসিক, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ডেটা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গুরুত্ব দ্রæত বাড়ছে।

তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত শুধু অপরাধী শনাক্ত করতেই সহায়তা করে না, নিরপরাধ কাউকে হয়রানির ঝুঁকিও কমিয়ে আনে। পিবিআই, ডিএনএ ল্যাব এবং আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তদন্ত ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক করার চেষ্টা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, বরং জনআস্থার ঘাটতি। একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গিয়ে কেমন আচরণ পেলেন, অভিযোগ কত দ্রুত গ্রহণ করা হলো এবং তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হলো, শেষ পর্যন্ত সেটিই পুলিশের প্রতি জনগণের বিশ্বাস নির্ধারণ করে।

পুলিশের তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে জনবান্ধব হিসেবে তৈরি করতে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণই ভিন্ন। বিগত সময়েও যেমন পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; এখনো এর কোনো ব্যতিক্রম কিছু দেখছি না। এভাবে চলতে থাকলে জনবান্ধব পুলিশের বদলে ভবিষ্যতে গজিয়ে উঠবে, একেকজন হারুন, হাবিব কিংবা বেনজীর।

সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু জনগণের আস্থা তৈরি করতে পারে না। জনবান্ধব, নিরপেক্ষ ও পেশাদার পুলিশ গড়তে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবিক আচরণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হলেও পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে পুলিশকে প্রকৃত অর্থে পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনীতে পরিণত করতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, বদলি-পদায়নে জবাবদিহি, তদন্তে স্বাধীনতা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পৃথক ব্যবস্থার। তবে এসব সুপারিশের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশে বর্তমানে এআইভিত্তিক রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম, হ্যালো ডিএমপি অ্যাপ, অনলাইন ট্রেনিং সিস্টেম, লিভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ট্রাফিক ডিউটি ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যার, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন সফটওয়্যার এবং ট্রাফিক নিউজ আর্কাইভসহ একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু রয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, পুলিশের প্রশাসনিক কার্যক্রম, সেবা প্রদান এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। তার ভাষ্য, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। অপরাধের ধরন যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কৌশলও আধুনিকায়নের প্রয়োজন হচ্ছে। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ছাড়া একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী কল্পনা করা যায় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। অনলাইন সেবা, ডিজিটাল তদন্ত, সাইবার সক্ষমতা এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ পুলিশের কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি একটাই, থানায় গেলে একজন সাধারণ মানুষ পুলিশকে কতটা নিজের মনে করেন। তাদের মতে, আধুনিক পুলিশ মানে শুধু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়। আধুনিক পুলিশ মানে এমন একটি বাহিনী, যে অপরাধীর কাছে কঠোর, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে মানবিক, নিরপেক্ষ এবং আস্থার প্রতীক। আর সেই আস্থাই একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।