আবাসন, শিল্পায়ন এবং জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আমুল আধুনিকায়ন করতে গাজীপুর মহানগরকে একটি সমন্বিত ‘সেফ সিটি’ বা নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে দেশের ইতিহাসে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথম ও বৃহৎ নগরী।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি), গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গৃহীত এই পরিকল্পনার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতিমধ্যে প্রকল্পটির অনুমোদন পাওয়া গেছে। বর্তমানে এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পটির মূল কারিগরি কাঠামোতে যুক্ত করা হচ্ছে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। মহানগরজুড়ে গড়ে তোলা হবে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক। এজন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইপি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্মার্ট মনিটরিং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এই নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থাপন করা হবে একটি অত্যাধুনিক কেন্দ্রীয় ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’।
সেখানে এআইভিত্তিক ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্বাভাবিক কিংবা সন্দেহজনক কর্মকা- শনাক্ত করবে। এছাড়া ফেস রিকগনিশন ক্যামেরার মাধ্যমে চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) ক্যামেরা ব্যবহার করে মহানগরীতে চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনের গতিবিধি ও অবস্থান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘ডেভেলপমেন্ট অব সেফ সিটি ইন ঢাকা’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এটি গৃহীত হলেও কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার চেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ার কারণে গাজীপুরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখানে সফল হলে পরবর্তীতে একইভাবে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটিতে অংশ নিতে এইচকে ভিশন, হুয়াওয়ে, ডাহুয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতা উপস্থাপন করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কারিগরি কমিটি সিস্টেম আর্কিটেকচার চূড়ান্ত করছে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা বলয় বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর শুধু শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
এ বিষয়ে জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য গাজীপুরের সাধারণ মানুষ, প্রায় ২০ লাখ পোশাক শ্রমিক এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সম্পদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব। শিল্প ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সবার আগে বাংলাদেশÑ এই নীতি বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকায়ন জরুরি। আশা করি, গাজীপুরবাসী খুব দ্রুত এই আধুনিক সেফ সিটির সব সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।’

