ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

আবার জুলাই… তবে ভারতে!

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

চলছে ২০২৬ সালের জুলাই। দুই বছর আগে ঠিক এই জুলাই মাসেই বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস। শুরুটা হয়েছিল ছাত্রদের একটি দাবি দিয়ে—সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ছাত্রদের দাবি রূপ নেয় সাধারণ মানুষের ক্ষোভে। আর শেষ পর্যন্ত সেই গণআন্দোলনের মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

বাংলাদেশের সেই জুলাই এখন শুধু একটি মাস নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আর ঠিক সেই জুলাই মাসেই এবার নতুন এক প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভারতের রাজপথেও কি দেখা যাচ্ছে তেমন কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমেছে। শুরুটা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট নিয়ে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের সুরে যুক্ত হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথাও।

আন্দোলনকারীরা সংসদ অভিমুখে মিছিলের চেষ্টা করেছে। তাদের দাবি—শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির দায় নিতে হবে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই আন্দোলন কি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনআন্দোলনের রূপ নিতে পারে?

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুটি ক্ষেত্রেই ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলনের শুরু, সরকারের জবাবদিহির দাবি এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকি ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ন্ত্রণের ঘটনাও বাংলাদেশের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা পরিষেবা বন্ধ, কারফিউ এবং সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে গোটা বাংলাদেশকে। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলন এমন এক রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে, যার পরিণতিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

তাহলে কি ভারতের ক্ষেত্রেও একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কারণ ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে আলাদা।

তবে এটিও সত্য, ইতিহাসে অনেক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরু হয়েছে ছাত্র আন্দোলন থেকে। যখন শিক্ষার্থীদের দাবি সাধারণ মানুষের অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি সীমিত আন্দোলনও বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দাবি করছে, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও বিজেপি বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্দোলন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে ভারতের তরুণদের সাফল্য এবং দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেছেন। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য—তারা শুধু প্রশংসা শুনতে চান না, তারা চান শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।

এর মধ্যেই পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধী দলগুলোও শিক্ষা সংকটের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয় সামনে এনে সরকারকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই দেখিয়েছে, একটি ছোট দাবি কখনো কখনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। একটি মিছিল, একটি স্লোগান কিংবা একটি প্রজন্মের ক্ষোভ—কখনো কখনো বদলে দিতে পারে একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

তবে ভারতের ২০২৬ সালের এই আন্দোলনের পরিণতি কী হবে, তা এখনো নির্ভর করছে আন্দোলনের বিস্তার, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

বাংলাদেশ দেখেছিল ২০২৪ সালের জুলাই। এখন ভারত দেখছে ২০২৬ সালের জুলাই। প্রশ্ন একটাই—এটি কি শুধুই একটি ছাত্র আন্দোলন, নাকি ইতিহাস আবারও কোনো বড় পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?