দেশের গ্রামাঞ্চলে কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যের বেহাল দশা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। গবেষণার তথ্যমতে, দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি তিনজনে দুজন (৬৪ শতাংশ) কিশোরী মাসিক-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে তীব্র ব্যথার কারণে অনেকেরই দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি ব্যথার কারণে স্কুলেও যেতে পারছে না বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি-র ‘অ্যাডসার্চ’ প্রকল্পের এ গবেষণার ফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতি প্রণেতা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যা স্কুল পর্যায় থেকেই কার্যকর শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে জরুরি করে তুলেছে।
তীব্র ব্যথায় বিঘিœত হচ্ছে শিক্ষা : আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের (এইচডিএসএস) আওতায় ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ মাস এ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সি এক হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশই কোনো না কোনো মাসিকজনিত সমস্যায় ভুগেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ‘ডিসমেনোরিয়া’Ñ যা দেখা গেছে ৫৬ শতাংশের মধ্যে। ৯ শতাংশ কিশোরী প্রতিনিয়ত এ তীব্র ব্যথায় ভোগে। মাসিকের তীব্র ব্যথার কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরীর প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। আর প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কিশোরী তীব্র ব্যথা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য জ্ঞানের বেহাল দশা : বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ীর ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সি অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর করা পৃথক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি কিশোর (৩৪ শতাংশ) এবং ১৬ শতাংশ কিশোরী জানতই না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর মেয়েরা গর্ভবতী হতে পারে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও তরুণ প্রজন্মের ধারণা অত্যন্ত সীমিত। ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে শুনলেও কিশোরীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। এছাড়া, জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (ইমার্জেন্সি কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল) সম্পর্কে ৩৮ শতাংশ কিশোর জানলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪ শতাংশ। গবেষকরা জানান, বিয়ের আগে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান-পরবর্তী জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। যেসব মেয়ে বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত, তাদের মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের হার অন্যদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক (১০ শতাংশের বিপরীতে মাত্র ৫ শতাংশ)।
আসছে প্রযুক্তিগত সমাধান : অনুষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বাড়াতে দুটি উদ্ভাবনী প্রকল্প তুলে ধরা হয়। এর একটি হলো চাঁদপুরের মতলবে স্মার্টফোন-ভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প এবং অন্যটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য বাংলা মোবাইল অ্যাপ ‘কৈশোর কথা’। এই অ্যাপটিতে অ্যানিমেটেড ভিডিও এবং ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্যের নানা ভুল ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ওজিএসবি-র সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল।
আলোচকরা বলেন, মাসিক নিয়ে সমাজে প্রচলিত লোকলজ্জা ও কুসংস্কার দূর করতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর তাদের কার্যক্রমে প্রাক-বৈবাহিক কাউন্সেলিং (বিয়ের আগের পরামর্শ) অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে বলেও জানানো হয়।
সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট) এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিতে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’র প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন