২০২৬ সালটি মানব ইতিহাসের পাতায় সম্ভবত সবচেয়ে অস্থির এবং রক্তাক্ত বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। বছরের শুরু থেকেই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে এবং ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ বিশ্ব এক গভীর অনিশ্চয়তার গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। একদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধ প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্রের আলোয় লাল হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের, তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষার্ধে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি প্রদেশে আকস্মিক ও শক্তিশালী বিমান হামলা শুরু করে। বিশেষ করে নাঙ্গারহার এবং পাকতিকা প্রদেশকে লক্ষ্য করে এ অভিযান চালানো হয়। পাকিস্তানের দাবি ছিল, এসব অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া জঙ্গি গোষ্ঠীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া। তবে এ হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের এই বিমান হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে তাৎক্ষণিক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে দুটি দেশ এখন ‘প্রকাশ্য যুদ্ধের’ মধ্যে রয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানান, তাদের ধৈর্য্য শেষ হয়ে গেছে এবং তারা এখন পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানবে। দীর্ঘস্থায়ী ডুরান্ড লাইন বিরোধ এবং জঙ্গি দমনে ব্যর্থতাই এই ভয়াবহ সংঘাতের মূল কারণ।
দক্ষিণ এশিয়ার এ যুদ্ধে বিশ্বশক্তিগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের এই সামরিক পদক্ষেপের প্রতি প্রকাশ্যে তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তানের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, চীন এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেইজিং আশঙ্কা করছে যে, এ যুদ্ধ তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে দুই দেশের অনড় অবস্থানের কারণে চীনের এই মধ্যস্থতার চেষ্টা এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, যদি দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হয়, তবে এ অঞ্চলে ভয়াবহ খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট দেখা দেবে। নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ডিপিআর বা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার যখন এই অবস্থা, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের পুরোনো শত্রুতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসী এক অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হয়। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে একযোগে বিশাল বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই অভিযানটি এতই শক্তিশালী ছিল যে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তেহরানসহ ইরানের প্রধান প্রধান শহরগুলো বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তেহরানের বাসিন্দারা বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দে জেগে ওঠেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের নিকটবর্তী এলাকা এবং আইআরজিসির সদর দপ্তরে আগুনের কু-লী উঠতে দেখা যায়। মার্কিন পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো এই হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এই অভিযানকে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ হামলা ইরানের দীর্ঘদিনের গর্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হামলার পরপরই ইরান চুপ করে থাকেনি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি বার্তায় ‘প্রতিশোধমূলক প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয়। ইরান তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে। ইরাক, সিরিয়া এবং জর্ডানের আকাশসীমায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গর্জন শোনা যায়। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানলে কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না। তারা এখন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
এই সংঘাতের ফলে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হুমকি তৈরি হয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে। ইরান হুমকি দিয়েছে যে, তারা এই প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে। যেহেতু বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়, তাই এ খবরে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানি তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার জন্ম দিচ্ছে।
দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বিমান রুটগুলো পরিবর্তন করতে হয়েছে। এর ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে বড় ধরনের ধস নেমেছে এবং বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণ ও ডলারের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করছেন। এ বছরের প্রথমার্ধেই বিশ্ব অর্থনীতি এক চরম মন্দার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব উভয় ফ্রন্টের সংঘাত নিরসনে জরুরি সাধারণ সভা আহ্বান করেছেন। তিনি বারবার শান্তি আলোচনার ওপর জোর দিলেও প্রভাবশালী দেশগুলোর ভেটো এবং স্বার্থের সংঘাতের কারণে কোনো কার্যকর প্রস্তাব পাস হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তারা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ত্রাণ পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে। রেড ক্রস এবং ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে, তেহরান এবং নাঙ্গারহারে আহতদের সংখ্যা ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এই মানবিক বিপর্যয় ঠেকানোর মতো শক্তি বা সদিচ্ছা কারো মধ্যেই দেখা যাচ্ছে না।
এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন প্রক্সি যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজগুলোতে হামলা তীব্র করেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে কিছু আঞ্চলিক শক্তি। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এখন এক বিশাল দাবানলে পরিণত হয়েছে। এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে। এই বহুমাত্রিক সংকটে নতুন নতুন জোট গঠিত হচ্ছে যা ভবিষ্যতের বিশ্ব ম্যাপ বদলে দিতে পারে।
মিসাইল ও ড্রোনের পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও চলছে ভয়াবহ যুদ্ধ। ইরান দাবি করেছে যে, তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎ গ্রিডে সাইবার হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা হ্যাক করার দাবি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই পক্ষই প্রচুর ভুয়া তথ্য ও ভিডিও শেয়ার করছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি করছে। তথ্যের এই গোলকধাঁধায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়ংকর নতুন দিক।
পাকিস্তানি ও আফগান সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে। শীতের প্রকোপ আর যুদ্ধের ভয়াবহতা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একইভাবে ইরানের শহরগুলোতে মানুষ বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। যুদ্ধের দামামা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছে। তারা এখন কেবল একটি শান্তিময় সকালের অপেক্ষায় আছে, যা বর্তমানে আকাশকুসুম কল্পনা বলে মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযান তার ভোট ব্যাংকে প্রভাব ফেলছে। একদল একে সাহসিকতা বললেও অন্যদল একে ব্যয়বহুল যুদ্ধ হিসেবে সমালোচনা করছে। মার্কিন নাগরিকরা বিদেশের মাটিতে তাদের সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নির্বাচনের বছরে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি বড় শক্তিগুলো কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ না করে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর এই জড়ানো পুরো মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের হুমকি। যুদ্ধের কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন ফ্রন্ট খোলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ বছরের মার্চ মাসটি মানব সভ্যতার জন্য এক চরম সন্ধিক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই আগুনের শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না।
এই বৈশ্বিক সংঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী কতটা ভঙ্গুর। পাক-আফগান সীমান্তে বেসামরিক মৃত্যু এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধকল সবই মানবজাতির সম্মিলিত ব্যর্থতার পরিচয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন