× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

বাজেট ২০২৬-২৭ : ডিজিটাল কমার্সে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

বাজেট ২০২৬-২৭ : ডিজিটাল কমার্সে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

গত ১১ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। তবে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় গুরুত্বের জায়গাটি হলো দেশের আইটি, ডিজিটাল কমার্স এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম। এই খাতের জন্য বাজেটে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা এই খাতের পুরো চেহারাটাই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আজকের দিনে ই-ক্যাব-এর ৩ হাজারেরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্য এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫ লাখের অধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজেটটি অত্যন্ত জীবনমুখী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশাল উদ্যোক্তা সমাজ কিন্তু আজ দেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস, সরবরাহ চেইন এবং তৃণমূলের কর্মসংস্থানের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। এই প্রেক্ষাপটেই গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম এবং খাতের অংশীজনদের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী মহলে বিভিন্ন দাবি ও সংস্কারের কথা বলে আসছিলাম, যার আলোকে আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর এবং সাথে সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং  বাংলাদেশ ব্যাংকে আমাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করি, যার একটি বড় প্রতিফলন এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে স্পষ্ট দেখা গেছে।

আমাদের ২৫-৩০ দফার মাস্টার প্ল্যান এবং বাজেটে ঐতিহাসিক প্রতিফলন

এই বাজেটটি আমাদের জন্য কেবল সরকারের একটি বার্ষিক হিসাবনিকাশ নয়, বরং এটি আমাদের দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টার একটি বড় বিজয়। আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আমরা যে ২৫ থেকে ৩০ দফার একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান ও সংস্কার দাবি তুলে ধরেছিলাম, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রায় ৭০ শতাংশেরই সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে।

১. কর ও ভ্যাট নীতিমালায় কাঠামোগত স্বস্তি : ফাইন্যান্স অ্যাক্ট-২০২৬ ও আইনি ধারার বিশ্লেষণ

এবারের বাজেটে ভ্যাট আইন ও আয়কর আইনের বেশকিছু ধারা, উপধারা ও তপশিলে (ঝপযবফঁষবং) যুগান্তকারী সংশোধন এনে আইটি ও অনলাইন সেক্টরের দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা দূর করা হয়েছে।

যেমন, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৪৫-এর উপধারা ১-এর বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন বা দাখিলপত্র জমা দেওয়ার তীব্র ভোগান্তি থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে উদ্যোক্তারা প্রতি মাসে না দিয়ে প্রতি ৩ মাস পর পর, অর্থাৎ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বছরে মাত্র ৪ বার ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

পাশাপাশি, আয়কর আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় নতুন এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর প্রারম্ভিক মূলধনের সংকট দূর করতে এবং ক্যাশ ফ্লো বাড়াতে প্রারম্ভিক ৫ বছরের জন্য করের হার শূন্য শতাংশ (০%) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২. ই-কমার্সের স্থায়ী শিল্প ও স্বতন্ত্র ট্রেড লাইসেন্স ক্যাটাগরির স্বীকৃতি

এই বাজেটের অন্যতম ঐতিহাসিক দিক হলো, ই-কমার্স বা ডিজিটাল কমার্সকে কেবল একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে একে জাতীয় শিল্প নীতিমালার অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘সেবা শিল্প’ হিসেবে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ই-কমার্স লজিস্টিকস, সরবরাহকারী সেন্টার ও ওয়্যারহাউসগুলো এখন থেকে বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে শিল্প হারে বিদ্যুৎ, পানি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের সুবিধা পাবে, যা ব্যাকঅ্যান্ড অপারেশনাল খরচ বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনবে।

৩. প্রযুক্তিপণ্য, হার্ডওয়্যার ও মোবাইল সেক্টরে শুল্ক হ্রাস : একটি অর্থনৈতিক ডেটা ও পরিসংখ্যান

ডিজিটাল কমার্স ও আইটি খাতের ব্যাকঅ্যান্ড অবকাঠামো শক্তিশালী করতে কাস্টম ট্যারিফ এবং অগ্রিম করে যে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা খাতের গতিশীলতা অনেক বাড়িয়ে দেবে।

প্রথমত, ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, সার্ভার ও কম্পিউটার মনিটরের কথা বলা যায়। কাস্টম অ্যাক্ট, ২০২৩-এর প্রথম তপশিল সংশোধন করে এই খাতটির ওপর থাকা পূর্বের উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার (০%) করা হয়েছে। ফলে সরাসরি আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক ও ভ্যাট মওকুফ হওয়ায় ফ্রিল্যান্সার ও আইটি কর্মীদের হার্ডওয়্যার খরচ নাটকীয়ভাবে কমবে।

দ্বিতীয়ত, কম্পিউটার প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও পোর্টেবল ডেটা ডিভাইসের ওপর আগে যেখানে ৫% অগ্রিম আয়কর বিদ্যমান ছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ২% করা হয়েছে, যা আইটি অফিস ও ডেটা সেন্টারের ব্যাক-অফিস খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।

খুচরা ও ওমনিচ্যানেল রিটেইলে পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পয়েন্ট অব সেলস (চঙঝ) মেশিনের ওপর থাকা পূর্বের ১০% আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫% করা হয়েছে এবং ৭.৫% অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার (০%) করা হয়েছে, যা ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

৪. মেগা প্রজেক্ট, বাজেট বরাদ্দ এবং লজিস্টিকস আধুনিকায়ন

বাজেট বক্তৃতায় এবার ই-কমার্স ও আইটি খাতের জন্য সরাসরি বরাদ্দ এবং পরিবেশবান্ধব পরোক্ষ প্রজেক্টের একটি সুষম রূপরেখা দেখা গেছে। তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এআইনির্ভর প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিতে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রাথমিক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ যৌথ-বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা হবে। যা ডিজিটাল কমার্সের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করবে।

৫. বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ই-কমার্স মার্কেটে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

এই প্রস্তাবিত বাজেট যদি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ডিজিটাল কমার্স মার্কেটে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ই-কমার্স বাজারের যে আকার, তা এই কর ছাড় ও অবকাঠামোগত সহায়তার কারণে আগামী ৩ বছরের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্কে পৌঁছাবে বলে আশা করা যায়।

চঙঝ মেশিনের শুল্ক হ্রাস এবং সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিজিটাল পেমেন্টের হার বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৩০% বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি সরকারের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ লক্ষ্যমাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।

একইভাবে ফ্রিল্যান্সিং ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমি সম্পূর্ণ করমুক্ত করায় আগামী দুই বছরে আইটি ও ই-কমার্স সাপ্লাই চেইনে আরও অন্তত ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে।

৬. দ্বিমুখী বাস্তবতা: শতভাগ বাস্তবায়ন বনাম আংশিক বাস্তবায়নের প্রভাব

তবে এই প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর দেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তার ভাগ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করছে। এর ফল ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুই দিকেই যেতে পারে।

সব প্রস্তাব যদি মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয় এবং কাস্টম ও ট্যাক্স পলিসি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে এটি ই-কমার্সকে দেশের মূলধারার অর্থনীতির চালিকাশক্তি বানাবে। ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তারা লিগ্যাল কাঠামোর মধ্যে এসে ব্যবসা বড় করতে পারবেন। ব্যাংকিং চ্যানেলে ট্রানজেকশন বাড়ায় ট্যাক্স টু জিডিপি (ঞধী-ঃড়-এউচ) রেশিও উন্নত হবে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল বাণিজ্যের অন্যতম হাবে পরিণত হবে।

একজন ডিজিটাল কমার্স উদ্যোক্তা এবং এই খাতের নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষক হিসেবে আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ব্যবসাবান্ধব রূপরেখা’ হিসেবে স্বাগত জানাই। কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার, ই-কমার্সকে সেবা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি এবং ভ্যাট রিটার্ন সহজীকরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘একটি চমৎকার নীতিও যদি মাঠপর্যায়ে ভুলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কোনো নীতি না থাকার চেয়েও ক্ষতিকর।’ আমরা, ডিসিআরএএফ এবং ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার জোর দিয়েছি যে, নীতিমালার সুফল যেন প্রান্তিক উদ্যোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছায়।

সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এই ঘোষিত প্রণোদনা, শুল্ক ছাড় ও আইনি সংস্কারের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ই-ক্যাবের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌক্তিকভাবে শক্তিশালী বাজেট বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সেল গঠন করা হোক। তবেই এই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!