ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, কিংবা কোনো রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা আমার ব্যাবসায়িক সিদ্ধান্ত বা ভাবনাকে পরিচালিত করেনি। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনÑ কোথাও আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। যখন থেকে বাংলাদেশ ই-কমার্সের ভাবনা শুরু হয় তখন থেকেই আমার পুরো সময়টাই কেটেছে ই-কমার্স বা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা, নতুন নতুন ই-কমার্স উদ্যোক্তা তৈরি করে এবং বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার একটি সহজ পরিবেশ তৈরি করার পেছনে। ই-কমার্স, প্রযুক্তি ও ব্যবসা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কখনোই আমার মনে হয়নি যে নিজের সুবিধার জন্য রাজনীতি করা প্রয়োজন। তবে যারা ব্যবসার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতি করেন, তাদের দক্ষতাকে আমি সম্মান করি।
আমার অবস্থান সব সময় খুব পরিষ্কার। যে সিদ্ধান্ত আমাদের ই-কমার্স খাতের জন্য, নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এবং সাধারণ সদস্যদের জন্য ভালো মনে হয়েছে, আমি মন থেকে সেটাকে সমর্থন করেছি। আর যেখানেই দেখেছি কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের খাতের ক্ষতি করছে বা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সুবিধা করে দিচ্ছে, সেখানেই কোনো ভয় না পেয়ে সরাসরি প্রতিবাদ করেছি।
ই-ক্যাব শুরুর আসল স্বপ্ন বনাম অতীতের ভুল নেতৃত্ব
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) কিন্তু কারো একার সম্পত্তি বা ব্যক্তিগত ক্লাবের মতো গড়ে ওঠেনি। দেশের প্রথম দিকের উদ্যোক্তারা যখন এই সংগঠনটি তৈরি করেছিলেন, তখন মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি অরাজনৈতিক, মেধাভিত্তিক এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। উদ্দেশ্য ছিল নতুনদের পথ দেখানো, ফেসবুকভিত্তিক ছোট উদ্যোক্তাদের ব্যবসার স্বীকৃতি দেওয়া এবং সরকারের কাছে আমাদের সাধারণ ব্যবসায়ীদের কথাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিগত কার্যনির্বাহী কমিটিগুলো (ঊঈ) একাংশ এই মূল উদ্দেশ্য থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যায়। একটি পেশাদার ব্যবসায়ী সংগঠনকে তারা নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখানোর জায়গা এবং নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে।
২০১৪ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারিভাবে অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সময় থেকেই সংগঠনের উন্নতির জন্য সময় শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করেছি শুধু সংগঠনকে নিজের আবেগের এক জায়গায় অবস্থান দিয়ে।
আমি এই একচেটিয়া আধিপত্য ও পকেট-সংগঠন বানানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে কথা বলেছি সবসময় ২০১৪ সালে একেক গঠিত হওয়ার পর থেকে। ২০১৮ সাল থেকেই যারা ই-ক্যাবকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল, তাদের অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি সোচ্চার ছিলাম। ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সরাসরি ভোটের জন্য লড়াই করেছি, পত্রিকায় লিখেছি, যাতে সাধারণ সদস্যরা তাদের আসল ভোটাধিকার ফেরত পান।
আপনাদের অভূতপূর্ব সমর্থন ও ভালোবাসার জোরেই ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো একটি সরাসরি নির্বাচন আয়োজন করতে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অসংখ্য চিঠি, সরাসরি দেখা এবং নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা বুঝানোর পর তখনকার পর্ষদকে বাধ্য করেছিলাম সিলেকশনের যুগ থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের ইলেকশনে নিয়ে আসা। তৎকালীন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপিয়ে দেওয়া আকাশচুম্বী ৭৫০০০ টাকার মনোনয়ন ফি কমিয়ে ২৫০০০ টাকায় নামিয়ে আনতে পেরেছিলাম, যাতে সাধারণ ও তরুণ উদ্যোক্তারা নির্বাচনে দাঁড়ানোর সাহস পান। ২০২২ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন কৌশলে আমাকে হয়তো বিজয়ী হতে দেওয়া হয়নি, কিন্তু আমি আপনাদের ছেড়ে যাইনি। ২০২৪ সালেও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আপনাদের অধিকারের লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলামÑ যদিও জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কারণে সেই নির্বাচন আর হতে পারেনি। এই পুরো লড়াইয়ে আপনাদের যে অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও বিশ্বাস পেয়েছি, তার জন্য আমি আজীবন ঋণী।
২২ হাজার কোটি টাকার বাজার, ১৫ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান অভিভাবকহীনতা তৈরি পোশাক খাতের পর আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে লজিস্টিকস ও অনলাইন ব্যবসা। বর্তমানে দেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স বাজারের বার্ষিক আকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এই খাতের সঙ্গে সরাসরি প্রায় ৫ লাখ ছোট ও নারী উদ্যোক্তা জড়িয়ে আছেন, আর কাজ করছেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ তরুণ ও ডেলিভারি রাইডার।
বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে ডিজিটাল বাণিজ্যের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের লক্ষ্যও ব্যাবসায়িক বৈষম্য দূর করে তরুণদের কাজের সুযোগ বাড়ানো। অথচ এত বড় একটি সম্ভাবনাময় খাত হওয়া সত্ত্বেও ই-ক্যাব আজ দীর্ঘদিন ধরে কোনো অভিভাবক ছাড়া ই-কমার্স খাতের চরম সংকটে ও অচলাবস্থায় পড়ে আছে।
সরকারের কাছে যে প্রধান দাবিগুলো থমকে আছে
একটি জাতীয় ব্যবসায়ী সংগঠনকে অবশ্যই সরকার, এনবিআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিয়ম করে আলোচনা চালাতে হয়। কিন্তু বিগত দিনের নেতৃত্ব ‘সহযোগিতা’র নামে রাজনৈতিক তোষণনীতি ও দুর্বল অবস্থান বেছে নিয়েছিল। আর বর্তমানে একজন সরকারি প্রশাসকের পক্ষে একজন নির্বাচিত ব্যবসায়ীর মতো টেবিল চাপড়ে সাধারণ সদস্যদের অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়।
প্রথমত, ভ্যাট-ট্যাক্সের অন্যায় চাপের কথা বলতে হয়। উদীয়মান ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের ওপর উল্টাপাল্টা ভ্যাট ও ট্যাক্সের নিয়মের কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, সহজ ট্রেড লাইসেন্সের ব্যাপক অভাব রয়েছে। দেশের সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাগুলোতে আজও ‘ই-কমার্স’ নামে আলাদা এবং কম খরচের ট্রেড লাইসেন্স চালু করা হয়নি।
তৃতীয়ত, বিদেশে পণ্য পাঠানো ও রপ্তানি সুবিধা থমকে আছে। দেশীয় পণ্য বিদেশে বিক্রি করার সহজ নিয়ম এখনো চালু হয়নি।
চতুর্থত, এসক্রো (ঊংপৎড়)ি নীতিমালার সমস্যা ও আটকে থাকা টাকার সংকট। সুদূরপ্রসারী চিন্তার অভাব এবং তখনকার কমিটির নিজেদের বাঁচানোর রাজনীতির কারণে যে এসক্রো নিয়ম চালু হয়েছিল, তার কারণে আজো সাধারণ ছোট ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের শত কোটি টাকা পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে আছে।
পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ না পাওয়া। ই-ক্যাবের অর্ধেকের বেশি সদস্য নারী ও এফ-কমার্স উদ্যোক্তা। কিন্তু সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা না থাকায় তারা ব্যাংক থেকে জামানত ছাড়া সহজ ঋণ বা সরকারি স্টার্টআপ ফান্ড পাচ্ছেন না।
‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫’ ও আদালতের আইনি জটিলতা
ই-ক্যাবসহ দেশের সব ব্যবসায়ী সংগঠনকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এবং ভুয়া ভোটার বন্ধ করতে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫’ তৈরি করেছে। সরকারি ডেটাবেজ যাচাই করে কেবল সত্যি সত্যি যারা ব্যবসা করেন, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই এই আইনের আসল উদ্দেশ্য।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অতীতের সুবিধাবাদী চক্রটি এখনো ই-ক্যাবকে নিজেদের কব্জায় রাখতে চায়। ভোটার তালিকা ভুয়া মুক্ত করার কাজ শুরু হলেই তারা আদালতে মামলা বা রিট করে নির্বাচন আটকে দেয়। অন্যদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রশাসকের পক্ষ থেকে আদালতের এই স্থগিতাদেশ সরানোর জন্য জোরালো কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। আইনি মারপ্যাঁচে নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখার এই নোংরা খেলার খেসারত দিচ্ছে ৫ লাখ সাধারণ উদ্যোক্তা।
ভুয়া ভোটারমুক্ত সঠিক এবং নির্ভুল তালিকা ও আইনি সুরক্ষা
আমি সব সময় বিশ্বাস করি, ই-ক্যাবকে একটি শতভাগ অরাজনৈতিক, স্বচ্ছ এবং আসল ব্যবসায়ীদের সংগঠনে রূপান্তর করার এখনই সঠিক সময়। অনেকেই তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের কথা বলছেন, কিন্তু আমার পরিষ্কার কথা হলোÑ প্রয়োজনে নির্বাচন কিছুদিন সময় নিয়ে হোক, কিন্তু বিগত দিনের মতো অ-ব্যবসায়ী ও ভুয়া ভোটার দিয়ে সাজানো কোনো প্রহসনের নির্বাচন আমরা হতে দেওয়া উচিত হবে না।
গত বছর বাতিল হওয়া ভোটার তালিকায় প্রচুর পরিমাণে অ-ব্যবসায়ী এবং নির্দিষ্ট পর্ষদের তৈরি ভুয়া ভোটার ঢোকানো হয়েছিল। সত্যি ব্যবসায়ী করেন কিনা, ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক লেনদেন আছে কিনাÑ তা না দেখে যদি আবার কাগুজে ‘কলাগাছ ভোটার’ রেখে নির্বাচন দেওয়া হয়, তবে নতুন কমিটিও একই অনিয়মের জন্ম দেবে।
উত্তরণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য
বাংলাদেশের ই-কমার্সের এত বড় সম্ভাবনাকে আদালতের চক্রান্ত আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি রাখা যাবে না। বর্তমান অচলাবস্থা ভেঙে একটি নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও নির্বাচিত ই-ক্যাব পুনর্গঠনে বেশ কয়েকটি জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, আরজেএসসি (জঔঝঈ), ট্রেড লাইসেন্স, সচল ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ এবং আসল লেনদেন ডিজিটাল সিস্টেমে মিলিয়ে দেখে কেবল সক্রিয় উদ্যোক্তাদের নিয়েই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বানাতে হবে। আসল উদ্যোক্তা যাচাই করে ভুয়া ভোটার পুরোপুরি বাদ দেওয়াই হবে প্রথম কাজ।
দ্বিতীয়ত, তরুণ ও নতুনদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দিতে মনোনয়ন ফি ২০২২ সালের মতো একদম সাধ্যের মধ্যে (২৫০০০ টাকার কাছাকাছি) রাখতে হবে, যাতে টাকার জোর নয়, মেধার জয় হয়।
তৃতীয়ত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ই-ক্যাবের প্রশাসকের উদ্যোগে আদালতের সব স্থগিতাদেশ ও রিট দ্রুত শেষ করার জন্য জরুরি আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ই-ক্যাব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বলয়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়Ñ এটি আমাদের লাখ লাখ সাধারণ উদ্যোক্তার ঘাম ও স্বপ্নের তৈরি সংগঠন। এখানে মতের অমিল থাকবে, সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনও হবেÑ তবে তা হতে হবে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ পরিবেশে। আসুন, অতীতের ভুলগুলো ভুলে আমরা সব সাধারণ উদ্যোক্তারা এক হই।

