আশির দশক। আমাদের ছেলেবেলা। সে সময়ে মফস্বল শহরে সিনেমা হলের সংখ্যা কম করে হলেও তিনটা! কোথাও কোথাও আরও বেশি। বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা। আমাদের বাড়ি শহরের প্রধান সিনেমা হলের একেবারে কাছে। প্রায়ই যাওয়া হতো। সপরিবারে। সে বয়সে ভালো-মন্দ খুব একটা না বুঝলেও সিনেমার ফাইটিং দৃশ্যগুলো বেশ লাগত। রীতিমতো রোমাঞ্চকর অনুভূতি! মনে আছে সে সময়ে রোমাঞ্চের বাইরে আরও একটা অনুভূতি মনের জানালায় উঁকি দেয় পর্দায় ভীষণ সুন্দরী এক নায়িকার ছবি দেখে। তার নাম ছিল সবার মুখে মুখে। ববিতা। তরুণ-প্রবীণ সব বয়সের সিনেমাপ্রেমীর কাছে ববিতা ছিল পছন্দে অদ্বিতীয়।
সেই সময়ে নায়িকা ববিতা যেমন ছিল আলোচিত তেমনি তার ব্যক্তি জীবনও ছিল সমান আলোচিত। বিশেষ করে সেই যুগে বাংলার এলভিস প্রিসলিখ্যাত জাফর ইকবালের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল সারা দেশে আলোড়িত বিষয়। নব্বইয়ের শুরুর দিকে অনিয়ন্ত্রিত জীবনের ভারে অকাল প্রয়াণ ঘটে নক্ষত্রসম জাফর ইকবালের। তার মৃত্যুর পর শোক চাপা পরে তাদের ব্যক্তিগত জীবন চর্চায়। ভক্তরা পরে যায় ধোঁয়ার আবরণে।
সাল ১৯৮৯। মোস্তফা আনোয়ার পরিচালিত সিনেমা ‘অবুঝ হৃদয়’ আমাদের মফস্বল সিনেমা হলে লেগেছিল নব্বই-একানব্বইয়ের দিকে। তখন সর্বোচ্চ আলোচিত জুটি জাফর ইকবাল-ববিতা। দিনের চারটা শো-ই থাকত হাউসফুল! তুমি আমার জীবন আমি তোমর জীবন দুজন দুজনার কত যে আপন আজকের দিনে বিশ^াস করানো যাবে নাÑ এই গান কি রকম আলোড়ল সৃষ্টি করেছিল। অনেকের কাছে এই গানটি ছিল সিনেমার মূল আকর্ষণ। ত্রিভূজ প্রেমের সিনেমা। ‘অবুঝ হৃদয়’ সেই সময় দর্শকের হৃদয়ে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল!
‘অবুঝ হৃদয়’ মুক্তির তিন বছরের মাথায় ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে জাফর ইকবাল মারা যায়। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে দেখতে যাই-যাই করেও ববিতার যাওয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ দেখতে হয় এফডিসিতে। অথচ এই এফডিসিতেই তাদের প্রথম দেখা! পরিচয়। প্রিয় সহশিল্পী এবং প্রিয় মানুষ হারানোর শোক ববিতার শিল্পীসত্তাকে একটুও বিচলিত করেনি। একের পর এক সিনেমা, তার অভিনীত চরিত্র কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও ববিতা সমান আলোচিত। এবার তিনি তার অভিনীত কোনো চরিত্র কিংবা সিনেমা নিয়ে নয়। বরং দীর্ঘ ষাট বছর ধরে চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি যে ভালোবাসার বীজ রোপণ করেছেন এবার তার ফল লাভের আলোচনা। দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র শিল্পে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত করেছেন।
খবরটা নিঃসন্দেহে ভীষণ আনন্দের এবং স্বস্তির। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের যখন ত্রাহি অবস্থা। এমন সময় এই প্রাপ্তি জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করবে এই অঙ্গনে। যদিও তিনি প্রথম ব্যক্তি নয়। তার আগে চিত্রনায়ক আলমগীর, ডলি জহুর, লায়লা হাসানরা এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু কথা হলো এই তালিকাটা আরও দীর্ঘ হওয়া উচিত ছিল।
এবারে ববিতার পুরস্কারপ্রাপ্তি অনেক বেশি আলোড়িত এবং অলংকৃত বটে! কারণ ববিতা বলে কথা, যে কি না বাংলা সিনেমার প্রতিচ্ছবি! পুরুষনির্ভর গল্পের সিনেদুনিয়ায় যার প্রভাব কখনো কখনো তার পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। দেশে এবং দেশের বাইরে। পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবন সচেতনভাবে যাপন করেছেন। সম্প্রতি তার পুরস্কারপ্রাপ্তির আলাপচারিতায় জানতে চাওয়া হয়, আপনার জীবন নিয়ে বায়োগ্রাফি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন? উত্তরে তিনি বলেছেন, চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী ববিতাকে সামনে আনব আর ব্যক্তিগত মানুষটাকে একান্তে রাখব। উত্তরটা আপনি যে ব্যারোমিটারে পরিমাণ করেন না কেন মার্জিত বটে! বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফরাসি চলচ্চিত্রের নামকরা হিরোইনরা ক্যারিয়ারের জৌলুশ থাকা অবস্থায় হঠাৎ অন্তরালে চলে যেতেন পর্দার জীবন থেকে। সেই সময়ে ফরাসি অভিনেত্রীদের অনেকে বিশ^াস করতেন তরুণ বয়সের যে জেল্লা দর্শকদের আলোড়িত করে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষীণ হয়ে আসবে। রূপের জোয়ারে ভাটা পড়লে দর্শক নির্মমভাবে পরিত্যাগ করবে। যে কারণে দর্শকের মানসপটে চির সবুজ হয়ে বেঁচে থাকতে রূপের আলো হঠাৎ করেই নিভিয়ে দিতেন। দার্শনিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে ঠিক আছে।
মেরিলিন মনরো, মধুবালা, দিব্যা ভারতী কিংবা সুচিত্রা সেনদের কল্পনা করলে স্মৃতিতে তাদের তারুণ্যের দৃপ্তি ভেসে উঠবে। যদিও এদের প্রস্থানের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ছিল। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যারা মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত এই শিল্পে নিজেকে প্রাসঙ্গিক এবং নিবেদিত মনে করেন তাদের মধ্যে আত্মবিশ^াসী ববিতা অনন্য। অভিনয়ে নেই প্রায় দেড় দশক। তার মানে তিনি অবসরে যাননি। এখনো তিনি আশা করেন, অপেক্ষা করেনÑ কেউ একজন আসুক, তাকে নতুন চলচ্চিত্রের গল্প শুনাক এবং তিনি আশ^স্ত হয়ে নতুন করে নিজেকে উজার করে দেবেন! কিন্তু কই? তার ভাষ্যমতো এই দায়বদ্ধতা এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে অনুপস্থিত। তার মনোভাবের মধ্যে পরিষ্কার তিনি অমৃত্যু একজন সক্রিয় অভিনয় শিল্পী হিসেবে নিজেকে বিশ^াস করেন।
ববিতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার আলোয় আজও আলোকিত হয় আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প। আজকের দিনে তার পুরস্কারপ্রাপ্তি প্রায় দম ফুরিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। যারা নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে এই শিল্পে আছেন তাদের কাছে ববিতা পাঠ অবশ্যই অত্যাবশক!

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন