একসময় দূর-দূরান্তের মানুষের খোঁজখবর, ভালোবাসার চিঠি, প্রবাসী স্বজনদের মানি অর্ডার কিংবা সরকারি জরুরি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল ডাকঘর। আশি ও নব্বইয়ের দশকে গ্রামীণ জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা সেই পোস্ট অফিসগুলোর অনেকটিই এখন অস্তিত্ব সংকটে। এরই বাস্তব চিত্র দেখা গেছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর পোস্ট অফিসে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, নাজিরপুর পোস্ট অফিসের পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাদে জন্মেছে শ্যাওলা। ভেতর ও বাইরে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। তালাবদ্ধ ভবনটি দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এখানে নিয়মিত ডাকসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অব্যবহৃত থাকায় ভবনটি এখন অনেকটাই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, দুই থেকে আড়াই দশক আগেও এই পোস্ট অফিস ছিল এলাকার মানুষের আস্থা ও যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত চিঠি আদান-প্রদান হতো। প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো মানি অর্ডার, পরীক্ষার ফল, চাকরির নিয়োগপত্র এবং সরকারি বিভিন্ন নোটিশ এখান থেকেই পৌঁছে যেত সাধারণ মানুষের হাতে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিঠির ব্যবহার কমে যায় এবং ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হয় পোস্ট অফিসটি।
নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখানে পোস্ট অফিসের যে ভবনটি আছে, সেটি একেবারেই পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। পোস্ট অফিসের পক্ষ থেকে একটি কক্ষ চাওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষ তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেওয়া হয়েছে।’
পোস্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবুল হাসান বলেন, ‘আমাদের পোস্ট অফিসের নিজস্ব ব্যবহারযোগ্য কোনো ভবন নেই। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষ ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে একটি কক্ষ বা ভবনের ব্যবস্থা হলে ভালো হতো। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
একসময় মানুষের আবেগ-অনুভূতির সেতুবন্ধ হিসেবে পরিচিত ডাকঘর এখন প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কাছে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি নানা সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে ডাক বিভাগের সম্পৃক্ততা এখনো রয়েছে। তাই এসব ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুনভাবে কার্যকর করে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।
নাজিরপুর পোস্ট অফিসের বেহাল চিত্র শুধু একটি ভবনের জীর্ণদশার গল্প নয়, এটি গ্রামীণ জনপদের এক সময়ের প্রাণচঞ্চল যোগাযোগব্যবস্থার নিঃশব্দ অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে দেশের ঐতিহ্যবাহী ডাকঘরগুলো কি একদিন কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে?

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন