শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের জালিয়াহাটি গ্রামের এক কোনায় যেন থমকে আছে একটি জীবন। বয়স পঞ্চাশের কোঠায় হলেও শুকুম আলীর পৃথিবীর পরিধি সীমাবদ্ধ মাত্র কয়েক ফুটের লোহার শেকলে। দীর্ঘ ১৮টি বছর সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার নাম। মানুষের মমতা আর চিকিৎসার অভাবে আজ পঙ্গুপ্রায় শুকুম আলী তার নিজের বাড়ির আঙিনায় বন্দি অবস্থায় এক করুণ আর্তনাদ হয়ে বেঁচে আছেন। খোলা আকাশের নিচে বা ঘরের চারদেয়ালের মাঝে যেখানেই থাকুন না কেন, পায়ের ওই নিষ্ঠুর লোহার শিকল তার চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।
শুকুম একসময় কৃষিকাজ করতেন, বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে মাঠের রোদে ঘাম ঝরিয়ে অন্ন জোগাতেন। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হলেও তার হাত ছিল কর্মঠ। কিন্তু ২০০৯ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এক বছর পর ঢাকার কেরাণীগঞ্জ থেকে যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ ও বিপর্যস্ত। এরপর থেকে পরিবারের শঙ্কা আর ভয়Ñ যদি আবার হারিয়ে যান! সেই ভয় থেকেই শুকুমের পায়ে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়া হয় শেকল।
ভাই লোকমান চৌকিদার অশ্রুসিক্ত অবস্থায় বলেন, ‘বাবা-মা মারা যাওয়ার সময় ভাইয়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। দুবার হারিয়ে যাওয়ায় ভয়ে বেঁধে রেখেছি। আমরা গরিব মানুষ, উন্নত চিকিৎসা করানোর সাধ্য আমাদের নেই।’
দীর্ঘ ১৮ বছরের বন্দিত্ব শুকুমের শরীর অচল করে দিয়েছে। শেকলে ঘষা লেগে তার বাঁ পা প্রায় অবশ হয়ে গেছে। একসময় যে মানুষটি মাঠ কাঁপিয়ে কাজ করতেন, আজ তিনি নিজের আঙিনায় দুই পা ফেলতেও অক্ষম। দীর্ঘদিনের এই অমানবিক বন্দিত্ব শুধু তার শরীরকেই নয়, কেড়ে নিয়েছে তার বেঁচে থাকার আনন্দও।
প্রতিবেশী আলীম বলেন, ‘আগে শুকুম ভাই হাঁটাচলা করতেন। দীর্ঘদিন শেকলে বন্দি থেকে তিনি এখন নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়েছেন। এটি দেখা খুবই যন্ত্রণাদায়ক।’
চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভাবে একজন মানুষের বছরের পর বছর এভাবে শেকলে আটকে থাকা কোনো সমাধান হতে পারে না। সমাজ সচেতন মহলের মতে, মানবিক সহায়তা, সঠিক চিকিৎসা এবং যথাযথ পুনর্বাসনের মাধ্যমে শুকুম আলীকে আবার একটি সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা দ্রুত তাকে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছি।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন