ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

দলিল কারসাজিতে কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁঁকি

বেনাপোল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

যশোরের শার্শা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত সাবরেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা নিবন্ধন অধিদপ্তরের টেলিফোনিক নির্দেশনার পর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়।

গত রোববার জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শার্শা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবরেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে অবিলম্বে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

অভিযোগ রয়েছে, শার্শার গোগা ইউনিয়নের সেতাই গ্রামের ৪৪ শতক সরকারি খাসজমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়। এ ঘটনায় সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একটি চক্রের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জমির ক্রেতা আফসার আলী জানান, কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে তিনি প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা দিয়ে জমিটি ক্রয় করেন। পরে জানতে পারেন, সেটি সরকারি খাসজমি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শার্শা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কম মূল্যে নিবন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি ও কর বাবদ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সম্পাদিত তিনটি দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকৃত মূল্য গোপন করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম মূল্য দেখানো হয়েছে। কবলা দলিল নং-২৩১২ অনুযায়ী বালুন্ডা মৌজার ২৫ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাগান শ্রেণির জমিকে ধানি জমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

একই দিনে সম্পাদিত দানপত্র দলিল নং-২৩৬৪-এ বুরুজবাগান মৌজার ১১ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় ৫ লাখ টাকা, যা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা কম। এ ছাড়া কবলা দলিল নং-২২৯২-এ বুরুজবাগান মৌজার ৩ দশমিক ২৬ শতক জমির মূল্য দেখানো হয় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, যেখানে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা কম দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনটি দলিলেই মোট ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা মূল্য গোপনের তথ্য উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় ১৫ মাসে অর্ধশতাধিক সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় রেজিস্ট্রি হয়েছে। এসব জমির অধিকাংশই সরকারি খতিয়ানের আওতাভুক্ত হলেও বিভিন্ন কৌশলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ ছাড়া দানপত্র, হেবা, ওয়ারিস সূত্রে মালিকানা হস্তান্তর, বিনিময় দলিল ও ভ্রম সংশোধন দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, দানপত্র বা হেবা ঘোষণাপত্রের ক্ষেত্রে প্রতি শতক জমির জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং বিনিময় বা ভ্রম সংশোধন দলিলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে।

সাবরেজিস্ট্রার শাহিন আলম ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ঝিকরগাছা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। পরে তিনি শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। একসঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন নিয়ে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।

গোগা ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও নতুন নয়। মানুষ সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তি দেখতে চায়।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম বাবু বলেন, খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় রেজিস্ট্রি এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অভিযুক্ত সাবরেজিস্ট্রার শাহিন আলম এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব বলেন, শার্শা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, সরকারি খাসজমি রাষ্ট্রের সম্পদ। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া এসব জমি হস্তান্তরের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।